নবম পে স্কেল: মন্ত্রিসভায় যাচ্ছে প্রস্তাব, দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা
নবম পে স্কেল মন্ত্রিসভায় যাচ্ছে, দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা

নবম পে স্কেল এখন মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে নতুন বেতন কাঠামো, ভাতা, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি হবে। তবে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে কোনও গ্রেডের নির্দিষ্ট বেতন, ভাতার অঙ্ক বা বর্ধিত বেতন পাওয়ার মাস নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। আপাতত অর্থ বিভাগের সামনে মূল কাজ হলো— মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব চূড়ান্ত করা এবং অনুমোদনের পর নতুন কাঠামো কার্যকরের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি শেষ করা।

মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নবম পে স্কেলের সুপারিশ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পর অর্থ বিভাগ প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পাঠাবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে সোমবার (৬ জুলাই) অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠক-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আগামী মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রস্তাবটি তোলা সম্ভব না হলে পরের সপ্তাহের বৈঠকে তা উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, নবম পে স্কেল বাস্তবায়নসংক্রান্ত কমিটির সুপারিশ আগের বৈঠকেই প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে বেসামরিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় এবং বিচার বিভাগসংক্রান্ত কয়েকটি কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির জন্য সর্বশেষ বৈঠকটি ডাকা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দুই ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজস্ব আদায়ের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথম ধাপে নতুন মূল বেতন কার্যকর করা এবং ভাতা পরের অর্থবছরে পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। শুরুতে তিন ধাপে বাস্তবায়নের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় চলতি অর্থবছরে নতুন মূল বেতনের ৫০ শতাংশ, পরের অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ এবং তার পরের বছরে বিভিন্ন ভাতা কার্যকরের চিন্তা ছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে আংশিক বাস্তবায়ন করলে কর্মচারীদের প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা কমে যেতে পারে। বিদ্যমান ইনক্রিমেন্টসহ অনেক কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে নতুন কাঠামোর সঙ্গে পুরোনো সুবিধা সমন্বয় করতে গিয়ে মোট আয় কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ কারণে নতুন মূল বেতন একবারে কার্যকর এবং বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াতসহ বিভিন্ন ভাতা ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পুনর্নির্ধারণের বিকল্পটি আলোচনায় এসেছে। এতে নবম পে স্কেল কার্যত দুই ধাপে বাস্তবায়িত হবে— প্রথম ধাপে মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে ভাতা। তবে বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত নয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি জানা যাবে।

প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি

নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের সবচেয়ে বড় কারিগরি কাজগুলোর একটি হলো ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম হালনাগাদ করা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ, ইনক্রিমেন্ট, বকেয়া এবং বিভিন্ন আর্থিক সুবিধার হিসাব এই ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ধাপে ধাপে মূল বেতন কার্যকর করা হলে সফটওয়্যারে বেতন নির্ধারণ, ইনক্রিমেন্ট সমন্বয়, বকেয়া হিসাব ও ভাতা নিরূপণে জটিলতা বাড়তে পারে। এ কারণেই মূল বেতন এক ধাপে কার্যকরের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে শুধু সফটওয়্যার হালনাগাদ করলেই হবে না। প্রতিটি কর্মচারীর বর্তমান বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পদ, গ্রেড ও অন্যান্য সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে নতুন বেতন নির্ধারণ করতে হবে। হিসাব অফিসগুলোতে সেই তথ্য যাচাই, ডেটা এন্ট্রি এবং বেতন বিল প্রস্তুতের কাজও শেষ করতে হবে। ফলে পে স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও বর্ধিত বেতন ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য হার

চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের আগে কোনও গ্রেডের বেতন নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে উচ্চপর্যায়ের কমিটির সম্ভাব্য সুপারিশ অনুযায়ী, ১ থেকে ১০ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন প্রায় ১০০ শতাংশ বা তার কিছু কম হারে বাড়তে পারে। অন্যদিকে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন গড়ে প্রায় ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কমিশনের প্রস্তাবে বিভিন্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা বলা হয়। তবে রাজস্ব আয়, বাজেট সক্ষমতা এবং বাস্তবায়ন ব্যয় বিবেচনায় চূড়ান্ত প্রস্তাবে পরিবর্তন আসতে পারে।

মহার্ঘ ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট

সরকারি কর্মচারীরা বর্তমানে মূল বেতনের সঙ্গে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা এবং ৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এসব সুবিধা নতুন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তবে মহার্ঘ ভাতা আলাদা সুবিধা হিসেবে বহাল থাকবে কি না, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার অপরিবর্তিত থাকবে কি না এবং অন্যান্য ভাতার অঙ্ক কীভাবে নির্ধারিত হবে— সেসব বিষয় গেজেট প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

সময়সীমা ও বকেয়া

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন পে-স্কেলের কার্যকারিতা ধরা হচ্ছে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে। তবে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী কর্মচারীভিত্তিক বেতন নির্ধারণ, সফটওয়্যার হালনাগাদ এবং বকেয়া হিসাব করতে সময় লাগবে। অষ্টম পে-স্কেলের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেটি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হলেও সরকারি কর্মচারীরা বর্ধিত বেতন পেয়েছিলেন ওই বছরের ডিসেম্বরে। এবারও বকেয়া অর্থ পরে সমন্বয় করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন ও পেনশনে সরকারের বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর হিসাব। এ কারণে নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণে রাজস্ব আদায়, বাজেট ঘাটতি এবং সরকারের সামগ্রিক ব্যয় সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন না হওয়া পর্যন্ত বেতনহার, ভাতার অঙ্ক এবং বর্ধিত বেতন পাওয়ার নির্দিষ্ট সময় নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি নুরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পে স্কেল কোন পর্যায়ে আছে, কীভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সে বিষয়ে গেজেট হওয়ার আগে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ সংযুক্ত পরিষদের আরেকটি অংশের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বেলাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গেজেট হবার আগে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তারা পে স্কেলের গেজেটের অপেক্ষায় আছেন।