অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার মুদি দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং করব্যবস্থার আওতা সম্প্রসারণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় থাকলেও দেশে খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কয়েক কোটি। শুধু বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবেই খুচরা বিক্রেতার সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখ। এই বাস্তবতায় মুদি দোকানসহ ১৬ থেকে ১৭ ধরনের ক্ষুদ্র ব্যবসাকে সুনির্দিষ্ট কর বা নির্ধারিত ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে সরকার।
দোকানিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
তবে এ ঘোষণা ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মুদি দোকানিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও, অনেকেই প্রথমবারের মতো এ তথ্য শুনেছেন বলে জানান। শুক্রবার (২৬ জুন) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেকেই সংবাদমাধ্যমে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেছেন। তবে কীভাবে কর আদায় হবে, কোন ধরনের দোকান করের আওতায় আসবে কিংবা কত টাকা কর দিতে হবে—এসব বিষয়ে এখনও তাদের স্পষ্ট ধারণা নেই।
এনবিআরের পরিকল্পনা
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসার ধরন, অবস্থান ও আকার বিবেচনায় বছরে এক হাজার, পাঁচ হাজার কিংবা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নির্দিষ্ট কর নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
রাজধানীর নয়াবাজারের আবুল কালাম স্টোরের মালিক বলেন, বর্তমানে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। এর মধ্যে নতুন করে করের বোঝা চাপলে ব্যবসা পরিচালনা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
রায়সাহেব বাজারের মায়ের দোয়া স্টোরের মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, সরকার যদি কর আরোপ করে, তাহলে অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে সমন্বয় করতে হতে পারে। এতে সাধারণ ক্রেতাদেরই বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হবে।
কেরানীগঞ্জের মডেল টাউনের মাশাআল্লাহ ভ্যারাইটিস স্টোরের মালিক আবিদ হোসেন বলেন, ‘গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন মুদি পণ্যের ব্যবসায় লাভ অনেক কমে গেছে। দোকানের সংখ্যা বেড়েছে, প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। কোনোমতে টিকে আছি। এর মধ্যে নতুন করে কর আরোপ করা হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিষয়ে সরকারের বিশেষ বিবেচনা করা উচিত।’
সহজ করব্যবস্থার দাবি
অধিকাংশ দোকানি কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে নীতিগতভাবে আপত্তি না থাকলেও তারা সহজ, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত কর ব্যবস্থা চান। তাদের দাবি, ব্যবসার আকার ও আয় বিবেচনায় কর নির্ধারণ করা হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। কয়েকজন ব্যবসায়ী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ব্যবসার ব্যয় বাড়লে শেষ পর্যন্ত কিছু নিত্যপণ্যের দামও বাড়তে পারে। ফলে এর প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।
অর্থনীতিবিদদের মতামত
অর্থনীতিবিদদের মতে, করের আওতা বৃদ্ধি রাজস্ব আহরণের জন্য ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে এ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তাদের মতে, শুরুতে নিবন্ধন ও তথ্যভান্ডার তৈরিতে গুরুত্ব দিয়ে পরে ধীরে ধীরে করব্যবস্থার আওতায় আনা হলে বাস্তবায়ন সহজ হবে। অন্যথায় ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
নীতিমালার অপেক্ষা
এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এখনও এ বিষয়ে বিস্তারিত নীতিমালা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোন আয়সীমার দোকান করের আওতায় আসবে, কী পদ্ধতিতে কর আদায় হবে এবং করের হার কত হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কর বিশেষজ্ঞদেরও মতে, জাতীয় পর্যায়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, সহজ কর পরিশোধ পদ্ধতি এবং হয়রানিমুক্ত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।



