ধনীদের উপর সম্পদ কর চালু করতে যাচ্ছে সরকার
সরকার ধনী করদাতাদের উপর বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রচলিত সারচার্জ পদ্ধতি বাতিল করে 'সম্পদ কর' চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইসাথে জমি ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য নির্ধারণে দলিল মূল্যের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক বা মৌজা মূল্য ব্যবহারের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সম্পদ কর আইনের খসড়া প্রস্তুত
প্রাসঙ্গিক সূত্রমতে, রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, বারিধারা এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরের এলিট এলাকার বিত্তবানদের করের আওতায় আনা এবং রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইতিমধ্যে 'সম্পদ কর আইন'-এর একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন পেলে এটি আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বর্তমান ও প্রস্তাবিত পদ্ধতির পার্থক্য
বর্তমানে করদাতার আয়কর আইনে নির্ধারিত সীমা অতিক্রমকারী সম্পদ থাকলে তাকে প্রদেয় আয়করের উপর নির্দিষ্ট হারে সারচার্জ দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, সম্পদ ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ১০%, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার জন্য ২০%, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার জন্য ৩০% এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের জন্য ৩৫% সারচার্জ প্রযোজ্য। তবে এই সারচার্জ গণনা করা হয় আয়করের উপর, সরাসরি সম্পদের উপর নয়।
নতুন প্রস্তাবিত পদ্ধতি কর গণনার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। সম্পদের উপর সরাসরি নির্দিষ্ট হারে কর আরোপ করা হবে। প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, ৪ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকার সম্পদের জন্য ০.৫০%, ১০ কোটি থেকে ২০ কোটি টাকার জন্য ১%, ২০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকার জন্য ১.৫০% এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের জন্য ২% হারে 'সম্পদ কর' আরোপ করা হবে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হচ্ছে - কোনো করদাতার সম্পদ কর তার প্রদেয় আয়করের চেয়ে বেশি হবে না।
কর কাঠামোতে ন্যায্যতা ও সরলীকরণ
কর কর্মকর্তারা বলেছেন, এতে কর ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং উচ্চ আয়ের পাশাপাশি উচ্চ সম্পদের মালিকদের কাছ থেকে আরও রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে। একইসাথে সারচার্জ পদ্ধতি বাতিল হলে কর কাঠামো সরলীকৃত হবে। সম্পদের মূল্য নির্ধারণে স্থানীয় মূল্য ব্যবহার করায় কর আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে দলিল মূল্যের ভিত্তিতে অনেক উচ্চমূল্যের সম্পদ করের বাইরে থেকে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০-এর দশকে কম দামে কেনা গুলশানের জমির বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা, কিন্তু এটি বিদ্যমান ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হয় না। নতুন নিয়মে এমন সম্পদ করের আওতায় আসবে।
রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা
এনবিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সারচার্জ থেকে ২৯৬ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০,০০০-এর বেশি করদাতা সারচার্জ হিসেবে প্রায় ৬৯৬ কোটি টাকা দিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন, সম্পদ কর কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বার্ষিক ১০,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব।
এই পদক্ষেপটি সরকারের রাজস্ব সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন। সম্পদ কর চালুর মাধ্যমে কর আদায়ের পরিধি বাড়ানো এবং অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মুখ্য উদ্দেশ্য।



