আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দীর্ঘদিনের চাপ ছিল—বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ভর্তুকি নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষিখাতে ভর্তুকি কমিয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণে যেতে হবে। কিন্তু, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রমবর্ধমান চাপ সরকারকে ভিন্ন পথে হাঁটতে বাধ্য করছে। ফলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা খাতে বরাদ্দ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বাড়ছে ভর্তুকির আকার
অর্থ বিভাগের প্রাথমিক বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ মোট বরাদ্দ ধরা হচ্ছে এক লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল এক লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। যদিও পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় নামানো হয়। সে হিসাবে সংশোধিত বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে ভর্তুকি বাড়ছে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
আইএমএফের শর্ত বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে এই ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫৫০ কোটি ডলারে। ঋণচুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল—বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধাপে ধাপে কমিয়ে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা। এই শর্ত পূরণে সরকার জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে। এতে কিছুটা ভর্তুকি কমানো সম্ভব হলেও বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
বিদ্যুৎ খাতেই সবচেয়ে বেশি চাপ
আগামী বাজেটেও সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। এ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। চলতি বাজেটেও একই অঙ্ক রাখা হয়েছিল, যদিও সংশোধিত বাজেটে তা কিছুটা কমানো হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র যুক্ত হওয়ায় আগামী বছর ভর্তুকির চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জ, উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
এলএনজিতে বাড়ছে সংকট
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম আবারও বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ায় সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি বাবদ ছয় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এপ্রিল পর্যন্ত ছাড় হয়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বড় বরাদ্দ
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কৃষিখাতে ভর্তুকি কমাতে রাজি নয়। কারণ, সারের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আগামী বাজেটে সারে মোট ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। বাকি ১০ হাজার কোটি টাকা যাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সার উৎপাদন ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। একইসঙ্গে ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতা বজায় রাখতে খাদ্য ভর্তুকি বাবদ প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার চিন্তা করছে সরকার।
প্রণোদনা অব্যাহত থাকছে
রফতানি ও রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখতে সরকার আগামী বছরও নগদ সহায়তা অব্যাহত রাখছে। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী—রফতানি প্রণোদনা রাখা হবে সাত হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। আর বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে প্রণোদনার জন্য ভর্তুকি দেওয়া হবে সাত হাজার কোটি টাকা। এছাড়া পাটজাত পণ্যে সহায়তায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তার জন্য নগদ ঋণ বাবদ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এলডিসি উত্তরণ ও নতুন চাপ
বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে উচ্চ ভর্তুকি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। যদিও সরকার এলডিসি উত্তরণে আরও তিন বছর সময় চেয়েছে, তারপরও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো ধীরে ধীরে ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রকাশ্যেই বলেছেন, আইএমএফের সব শর্ত বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একটি আলোচনায় তিনি বলেন, সরকার একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। তাই এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যা জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। তার ভাষায়, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নীতিগত সমন্বয় থাকলেও সব বিষয়ে একমত হওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে এমন শর্ত, যা দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জন্য উপযোগী নয়, তা অন্ধভাবে বাস্তবায়ন করা হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মত: শুধু দাম বাড়িয়ে সমাধান নয়
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকি কমানো অর্থনীতির জন্য ভালো হলেও বর্তমান বাস্তবতায় হঠাৎ ভর্তুকি কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তার মতে, মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম আবার বাড়ালে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়বে বাজারের সব পণ্যে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন আয়ের মানুষ। তিনি আরও বলেন, ভর্তুকির চাপ কমাতে শুধু দাম বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতি, সিস্টেম লস, মিটার টেম্পারিং এবং চুরি বন্ধ করতে পারলে সরকারের ব্যয়ও কমবে।
অন্যদিকে, ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, গত দেড় দশকে জ্বালানি খাতে ব্যাপক অনিয়ম ও লুণ্ঠনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সেই অপচয় ও দুর্নীতি বন্ধ করা গেলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো কিংবা অতিরিক্ত ভর্তুকি—দুটোরই প্রয়োজন কমে যাবে।
রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার এক ধরনের ‘রাজনৈতিক অর্থনীতি’র বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে আইএমএফের সংস্কার চাপ, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত জনগণ। ফলে সরকার এখন এমন একটি ভারসাম্য খুঁজছে, যেখানে আন্তর্জাতিক ঋণ কর্মসূচি সচল রাখা যাবে, আবার একই সঙ্গে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপও না পড়ে। তবে, এতে আগামী বছর বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা ও সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।



