দেশের কর ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সূচনা করতে যাচ্ছে সরকার। প্রতি বছর বাজেট ঘিরে করহার ও করমুক্ত আয়সীমা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তা কমাতে প্রথম বারের মতো ব্যক্তি করদাতাদের জন্য একটি আয়কর রোড ম্যাপ ঘোষণা করা হতে পারে। আগামী ১১ জুন জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমা, করহার ও কর কাঠামো বিষয়ে একটি নীতিগত দিকনির্দেশনা তুলে ধরার প্রস্তুতি চলছে।
করমুক্ত আয়সীমায় ধাপে ধাপে বৃদ্ধি
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থাকা করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ আগামী পাঁচ বছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ১ লাখ টাকা বাড়তে পারে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উদ্দেশ্য
নীতিনির্ধারকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো কর ব্যবস্থাকে আরো পূর্বানুমানযোগ্য, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা। এর ফলে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং বিনিয়োগকারীরা আগাম ধারণা পাবেন ভবিষ্যতে কর কাঠামো কোন দিকে যেতে পারে। এতে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।
বর্তমানে দেশে করনীতি মূলত বার্ষিক বাজেটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ফলে প্রতি বছর করমুক্ত আয়সীমা বাড়বে কি না, করহার পরিবর্তন হবে কি না বা নতুন কোনো কর আরোপ হবে কি না—এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি রোড ম্যাপ এ ধরনের অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হবে।
মূল্যস্ফীতি ও করদাতাদের স্বস্তি
সরকারের যুক্তি, মূল্যস্ফীতির প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ধীরে ধীরে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলে সাধারণ করদাতারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন, একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকবে। তবে অনেকেই মনে করেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় করমুক্ত আয়সীমা আরও দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে করদাতাদের প্রকৃত স্বস্তি দিতে হলে করমুক্ত আয়ের সীমা আরো বেশি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
করনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীতির ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্যতা। করদাতারা আগাম জানতে পারলে ভবিষ্যত্ আয়, সঞ্চয় ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা আরো বাস্তবসম্মতভাবে করতে পারবেন। তবে তারা সতর্ক করে বলছেন, করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর পাশাপাশি করের বিভিন্ন স্তর বা ব্র্যাকেট সময়োপযোগীভাবে সমন্বয় না করা হলে মধ্যবিত্ত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দীর্ঘমেয়াদি রোড ম্যাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত আয়কর রোড ম্যাপ বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত পরিকল্পনা কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তা করদাতাদের জন্য কতটা কার্যকর স্বস্তি বয়ে আনে তার ওপর।
সম্পদ কর নয়, বহাল থাকছে সারচার্জ
আয়কর আইন ২০২৩ ও অর্থ আইন ২০২৫ অনুযায়ী সম্পদের ওপর সারচার্জই বহাল থাকছে। ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত, ৪-১০ কোটি টাকায় ১০ শতাংশ, ১০-২০ কোটি টাকায় ২০ শতাংশ, ২০-৫০ কোটি টাকায় ৩০ শতাংশ এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি হলে ৩৫ শতাংশ সারচার্জ প্রযোজ্য। একাধিক গাড়ি বা ৮ হাজার বর্গফুটের বেশি বাড়ি থাকলেও এই সারচার্জ দিতে হয়। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার ৮০৪ জন করদাতা এই আওতায় আছেন, যাদের মোট ঘোষিত সম্পদ প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আসে। সম্পদ কর চালুর প্রস্তাব থাকলেও তা শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে।
ন্যূনতম কর ও উৎস কর সমন্বয়
আসন্ন বাজেটে উৎস কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। আগে অনেক ক্ষেত্রে উৎস করকে চূড়ান্ত ন্যূনতম কর হিসেবে গণ্য করা হলেও নতুন ব্যবস্থায় তা আর হবে না। বরং বছর শেষে প্রকৃত করদায়ের সঙ্গে উৎস কর সমন্বয় করা যাবে এবং অতিরিক্ত পরিশোধিত কর রিফান্ড বা পরবর্তী করবর্ষে সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প, আমদানিকারক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা পাবে এবং পুরো প্রক্রিয়া ই-টিডিএস সিস্টেমে পরিচালিত হবে।



