নতুন সরকারের রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড ৯৭ হাজার কোটি টাকা
নতুন সরকারের রাজস্ব ঘাটতি রেকর্ড ৯৭ হাজার কোটি

নতুন সরকারের বয়স তিন মাসও হয়নি। ক্ষমতায় এসেই বিএনপির সরকার বেশ অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। বিদেশি ঋণের বোঝা, ব্যালেন্স অব পেমেন্টের বড় ঘাটতি এবং জ্বালানি সংকটের চাপ তো রয়েছেই। এর মধ্যে বড় সংকট হিসেবে যুক্ত হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি। কীভাবে জুনে জাতীয় বাজেট করা হবে সেটাই বড় চ্যালেঞ্জ।

রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি

দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, মার্চ অবধি চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে শুল্ক কর আদায়ে ঘাটতি ৯৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, যা যেকোনও সময়ের বিবেচনায় এযাবৎকালের রেকর্ড ঘাটতি। গত অর্থবছরের পুরো সময়ে এনবিআরে ঘাটতি হয়েছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা, যা তখনও রেকর্ড ছিল। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসেই তা ছাড়িয়ে গেছে। জুলাই-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর এই তিন খাতের মধ্যে কোনও খাতেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

আইএমএফের শর্ত ও চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তের মুখে এত বিশাল ঘাটতিতে পড়লো এনবিআর। লক্ষ্য অর্জনে অর্থবছরের বাকি সময়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা কর আদায়ের চাপ রয়েছে এনবিআরের ওপর। নতুন সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো শুল্ক কর আদায় বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজস্ব খাতের যে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ঝুলে গেছে। এনবিআর বিলুপ্ত করার অধ্যাদেশটি জাতীয় সংসদে পাসের জন্য উঠায়নি নতুন সরকার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশাল রাজস্ব আদায়ের চ্যালেঞ্জ নতুন সরকারের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে। বাজেটের মাধ্যমে সরকারের খরচের চাপ ক্রমশ বাড়ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে সরকারের আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তও আছে। ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের শর্ত হিসেবে প্রতি বছর জিডিপির আধা শতাংশের বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। এ ছাড়া সরকারের উন্নয়ন খরচ বাদে পুরো খরচই অভ্যন্তরীণ রাজস্ব দিতে হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতা

এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যবসা বাণিজ্যের শ্লথগতি থাকায় রাজস্ব আদায় হয়েছে তুলনামূলক কম। করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন নিশ্চিতকরণ, কর ফাঁকি প্রতিরোধ এবং ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব পুনরুদ্ধার করার কাজ করছে এনবিআর। নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো—আগামী তিন মাসে বিপুল পরিমাণ শুল্ক কর আদায় করতে হবে। এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে আদায় করতে হবে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে ৭১ হাজার ৭১২ কোটি টাকা আদায় না করলে লক্ষ্য অর্জন হবে না। এত বিপুল অর্থ আদায় করা সহজ নয়। কারণ চলতি অর্থবছরের কোনও মাসেই এত রাজস্ব আদায় হয়নি।

রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্য অর্জনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ব্যবসা বাণিজ্যের গতি স্বাভাবিক করা। পুরোনো রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিশাল লক্ষ্য অর্জন কঠিন। এ জন্য সংস্কার প্রয়োজন এ কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। আইএমএফের অন্যতম শর্ত ছিল রাজস্ব খাত সংস্কার। সেটিও আটকে গেছে। এতে ঋণের কিস্তি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ফলে বিদেশি উৎস থেকে সরকারের অর্থ পাওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

কর কাঠামোর পরিবর্তন

এ ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, ঘুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এসব পুরোনো সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু সরকার অভ্যন্তরীণ সম্পদ অর্থাৎ ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করে মাত্রা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে যাচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত কর ব্যবস্থায় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও করের প্রকৃত বোঝা বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে। আয় না বাড়লেও নতুন স্ল্যাব ও করহারের কারণে বেশিরভাগ করদাতাকে আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন স্থাবর সম্পদের ওপর ‘সম্পদ কর’ আরোপের পরিকল্পনাও কর কাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করছে।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় নির্ধারিত থাকবে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরে। এর বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে কর আরোপ হবে পরে ৩ লাখ টাকায় ১০ শতাংশ, এরপর ৪ লাখে ১৫ শতাংশ, ৫ লাখে ২০ শতাংশ, তার পরের ২০ লাখে ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ে ৩০ শতাংশ কর প্রযোজ্য হবে। আগের তুলনায় স্ল্যাব সংখ্যা কমানো হলেও প্রতিটি স্তরে করহার বাড়ানো হয়েছে, যা সরাসরি করদাতার দায় বাড়াবে। আগে সাত ধাপে কর নির্ধারণ করা হলেও এখন তা ছয় ধাপে সীমিত করা হয়েছে, তবে প্রতিটি ধাপে করহার গড়ে ৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ আয়ের সব শ্রেণির করদাতার ওপরই বাড়তি চাপ পড়বে।

করের বোঝা বাড়ছে

ধরুন কোনও ব্যক্তির বার্ষিক আয় যদি ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা হয়, তাহলে আগের ব্যবস্থায় তার করযোগ্য আয়ের ওপর প্রায় ৮ হাজার টাকা কর দিতে হতো। কিন্তু নতুন কাঠামোয় একই আয়ে করের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ আয় অপরিবর্তিত থাকলেও কেবল কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে কর বাড়ছে। তবে নতুন করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি রাখা হয়েছে। প্রথমবার রিটার্ন দাখিলকারীরা আয়ভেদে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে সীমিত কর দিয়ে কর নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারবেন; যা করভীতি কমাতে সহায়ক হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের যুক্তি হলো, করমুক্ত আয়সীমা বেশি বাড়ালে করজালের আওতা সংকুচিত হবে। সে কারণে বিদ্যমান সীমা বজায় রেখে কর সংগ্রহ বাড়ানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায়েই নির্ধারিত হবে।

অপরদিকে, সারচার্জের বিকল্প হিসেবে ‘সম্পদ কর’ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জমির দলিল মূল্যের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক (মৌজা দর) মূল্যে কর নির্ধারণের মাধ্যমে উচ্চমূল্যের আবাসিক এলাকার সম্পদশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে বেশি রাজস্ব আহরণের লক্ষ রয়েছে। এর মাধ্যমে কর ব্যবস্থায় ভারসাম্য আনা এবং বৈষম্য কিছুটা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কাঠামোর ফলে আয় অপরিবর্তিত থাকলেও করদাতার দায় বাড়বে এটি মূলত হিসাব পদ্ধতির পরিবর্তনের ফল। তবে সরকার চাইলে চূড়ান্ত বাজেটে এ কাঠামোয় সমন্বয় আনার সুযোগ এখনও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বছর দুয়েক আগে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে ‘জাতীয় বাজেট কতটা জনবান্ধব’ শীর্ষক এক টকশোতে অংশ নিয়েছিলাম। সহ-আলোচক ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম। প্রান্তিক জনগণের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে বৃহৎ শ্রেণির করদাতার সঠিক করযোগ্য আয় নিরূপণ করে তা আদায়ের চেষ্টা করা—যা আমার পরামর্শ ছিল আলোচনায়। তাতে কর জিডিপির হার বাড়বে। মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মন্তব্য ছিল ফাঁকিবাজ বড় একজন করদাতার করযোগ্য আয়ের সমান ৩৮ হাজার সাধারণ করদাতার মোট আয়! এনবিআরকে সাধারণ করদাতার চেয়ে বৃহৎ করদাতার সঠিক আয়কর আদায়ের পিছনে পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু একজন করপোরেট করদাতার সঠিক আয়কর নির্ণয় করার সামর্থ্য ও উপযুক্ত জনবল নেই এনবিআরের। বাস্তবতা হলো করপোরেট করদাতা তার প্রতিষ্ঠানের হিসাব রক্ষায় হিসাববিদ মানে চার্টার্ড অ্যাকাউটেন্ট (এফসিএ) নিয়োগ করেন। ড. আইনুলের মতামত ছিল পরোক্ষ কর মানে মূসক (মূল্য সংযোজন কর) বাড়লে সাধারণ জনগণ অর্থাৎ প্রান্তিক মানুষ বেশি কষ্ট পায়।

অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সঙ্গে ১৯৯২ সালে প্রাক বাজেট আলোচনায় বেশ দুঃখ করে কিছু বাস্তবতা বিনিময় করেছিলেন অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান। তাঁর দুঃখজনক মন্তব্য ছিল—বিত্তবানরাই দেশে বেশি কর ফাঁকি দেয়! বৃহৎ করদাতা শ্রেণির কর রাজস্ব যা আদায় হয়, তা যদি ১০ শতাংশ বেশি আদায় করা যেতো—তাহলে সে সময়কার আকারের তিনটি জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা সম্ভব হতো। বাজেটের জন্য দাতাদের মুখাপেক্ষী হতে হতো না। অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকেই জাতীয় বাজেটের ব্যয় সংগ্রহ করা সম্ভবপর হতো।

রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনায় অযোগ্যতার কথা বলতেন বিশিষ্ট ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। কর প্রশাসনে সংস্কারের প্রস্তাবে তিনি দুর্নীতিবাজ কর পরিদর্শকের পরিহারে কঠোর হবার কথা যেমন বলতেন তেমনি তিনি রাজস্ব আদায়ে নিয়মিত উৎসাহব্যঞ্জক প্রণোদনা প্রস্তাবও দিয়েছিলেন সরকারকে।

অতীতের বাজেট ও ভবিষ্যৎ

বিগত দিনগুলোতে জাতীয় বাজেটগুলো ছিল উচ্চাভিলাষী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা গত ১৭ বছরে অর্জন করতে পারেনি। ঘাটতি বাজেট বাড়ছে। ব্যয় মিটানোর জন্য বিদেশি ঋণ যেমন বাড়ছে তেমনই বাড়ছে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা। বেসরকারি খাতে ঋণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে ব্যাপকভাবে।

সামাজিক উন্নয়নের জন্য সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার দায়িত্ব তো সরকারেরই। যারা বেশি আয় করেন তারাই বেশি কর প্রদানের ক্ষমতা রাখেন—যা ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। তেল মাথায় তেল না দিয়ে তেলহীন মস্তকে তেল দেওয়াই সঠিক কাজ। তাই ব্যক্তি করদাতা এবং প্রান্তিক জনগণের প্রতি সদয় হয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। কর আদায়ে নিজেদের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে হবে এনবিআরকে। কর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিবার সদস্যদের সম্পদ ও আয় হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কর আদায়ে এনবিআরের ব্যর্থতার দায় সাধারণ করাদাতারা বহন করবে কেন? তাদের ওপর খড়গ হয়ে অন্যায্য ও অযৌক্তিক করারোপ পরিহার করতে হবে। তাই কর নিয়ে কড়াকড়ি করা বিপদ ডেকে আনতে পারে তা মনে রাখতে হবে এনবিআরকে।

লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক- অর্থকাগজ