ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর এবার নতুন সংকটের মুখে পড়েছে তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেক। অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সদস্যদেশগুলোর উৎপাদন কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো এই জোট ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উৎপাদন প্রতিযোগিতা
হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ায় বাজারে তেলের অতিরিক্ত সরবরাহের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা তেলের দামকে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল হওয়ায় যুদ্ধকালীন ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ইরাক ও কুয়েতের মতো সদস্যদেশগুলো দ্রুত তেল উৎপাদন বাড়াতে মরিয়া।
ইরাকের হুমকি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রস্থান
জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদক ইরাক ইতিমধ্যেই উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়ালে ওপেক ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির লক্ষ্য এখন দৈনিক ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করা। এর আগে গত এপ্রিলে অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে যায়, যা ওপেকের সংহতিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
সৌদি আরবের অবস্থান
ওপেকের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবের অবস্থান এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরাক বা কুয়েতের বিপরীতে লোহিত সাগর হয়ে রপ্তানির সুযোগ থাকায় সৌদি আরব যুদ্ধের সময়ও তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। বর্তমানে বৈশ্বিক চাহিদা পুরোপুরি না ফেরায় সৌদি আরব অতিরিক্ত উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের দাম কমিয়ে ফেলার পক্ষে নয়। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে অতিরিক্ত তেল ছাড়া সৌদি আরবের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তবুও অভ্যন্তরীণ চাপ সামলাতে বাধ্য হলে সৌদি আরব উৎপাদন বাড়িয়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে নামিয়ে আনতে পারে—এমন আর্থিক সক্ষমতাও তাদের আছে।
বৈশ্বিক চাহিদা ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস
যুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে চীন ও ইউরোপের মতো বড় বাজারগুলো তেলের বিকল্প ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, ফলে চাহিদা যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। মার্কেট অ্যানালিস্টদের ধারণা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের আগে কৌশলগত মজুত পূরণের সম্ভাবনা কম। বাজার বিশ্লেষক কেপলারের তথ্যমতে, সরবরাহ বাড়লে তা প্রায় ৯ কোটি ব্যারেল তেলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পড়বে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলার এবং ২০২৮ সালে ৫০ ডলারে নেমে আসতে পারে।
উপসংহার
ওপেকের ঐক্য টিকিয়ে রাখা এখন কেবল বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মোকাবিলা করার জন্যও জরুরি। তবে সৌদি আরব যদি উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, তবে সেটি হবে এক নির্মম বিদ্রূপ। কারণ ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সংকট দেখেছিল, আর এখন সেই ইরান সংকটের জেরেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অতিরিক্ত সরবরাহের ধস নেমে আসতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ওপেক তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে নাকি তেলের বাজারে এক ভয়াবহ মূল্যযুদ্ধের সূচনা হয়।



