বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস, দেশে কমবে কবে?
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধস, দেশে কমবে কবে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বড় ধসে পড়েছে। বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৩ ডলারে নেমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সম্ভাবনা নেই বলেই জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।

বিপিসির লোকসানের কারণে দাম কমানো সম্ভব নয়

বিপিসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আপাতত দেশে তেলের দাম কমানোর পক্ষে নয় তারা। কারণ, বিপিসি বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে গত চার মাসে লোকসান হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেছেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কিনে এখনো লোকসান দিতে হচ্ছে সরকারকে। তাই আপাতত তেলের দাম কমানো যাবে না। তবে আশার কথা, তেল কিনে বিপিসিকে প্রতিমাসে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিতে হতো, সেটি এখন অনেক কমে এসেছে।”

দামের ওঠানামার চিত্র

২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার থেকে বাড়তে থাকে। ৪ মে সেই দাম ১১৪ দশমিক ৪৪ ডলারে উঠে যায়। ২৪ জুন তা নেমে আসে ৭৫ দশমিক ৫০ ডলারে। বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, মে মাসে ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেলবাহী জাহাজের বিল দিতে হয়েছে ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত, যেখানে এখন দিতে হচ্ছে ৩ কোটি ডলার। বাংলাদেশ প্রতিমাসে ১৫ জাহাজের মতো তেল কিনে থাকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের রাজস্ব ও বিপিসির লোকসান

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, তেল আমদানি করে এখন বিপিসির লোকসান হলেও সরকারের আর্থিক ক্ষতি নেই। পার্ল্টস সিঙ্গাপুর ফর্মুলা অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে বিপিসির খরচ ১২৯ টাকা, আর বিক্রি করা হচ্ছে ১১৫ টাকায়। তবে অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি করে লাভ হচ্ছে। অকটেন প্রতি লিটার ১৪৫ এবং পেট্রোল ১৪০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। ডিজেল আমদানিতে প্রতি লিটারে এনবিআর ৩৫ টাকা শুল্ক নিচ্ছে, ফলে বিপিসি প্রতি লিটারে ১৪ টাকা লোকসান করছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লোকসান পুষিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি

বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা ছিল, যা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা তুলে লোকসান সামাল দেওয়া হয়েছে। এখন সেই টাকা ফেরত দিতে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে বিপিসি। চিঠিতে এনবিআরের আমদানি শুল্ক আপাতত মওকুফের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

আইএমএফ ফর্মুলায় নতুন দাম নির্ধারণ

আইএমএফ-এর ফর্মুলা অনুযায়ী বিপিসি আগের মাসের ২১ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত তেলের আমদানি ব্যয় গড় করে পরবর্তী মাসের দাম নির্ধারণ করে। ২১ মে থেকে ২০ জুন পর্যন্ত প্রতি লিটার ডিজেল কেনা পড়েছে ১৫৩ টাকা ২১ পয়সা, আর অকটেন ১৪৪ টাকা ৪৭ পয়সা। এই হিসাবে ১ জুলাই থেকে তেলের নতুন দাম ঘোষণা করবে সরকার।

দেশে তেলের মজুত সন্তোষজনক

২৪ জুন পর্যন্ত ডিজেলের মজুত ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার টন (৪২ দিন), অকটেন ৩২ হাজার ৭১৪ টন (৩২ দিন), পেট্রোল ২২ হাজার ৩০০ টন (২৪ দিন), ফার্নেস অয়েল ৫৪ হাজার ৪৩১ টন (২২ দিন), জেট ফুয়েল ৩১ হাজার ১৫৮ টন (২১ দিন), কেরোসিন ১৪ হাজার ৪৫১ টন (৭৬ দিন) এবং মেরিন ফুয়েল ১ হাজার ২৬ টন (৩০ দিন)।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সতর্কতা

জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ৩ লাখ টন ডিজেল, ২৫ হাজার টন অকটেন, ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল এবং ৬০ হাজার টন জেট ফুয়েল কিনবে বিপিসি। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জি-টু-জি চুক্তির মাধ্যমে আরও ১৬ লাখ টন তেল কেনা হবে। এজন্য সিঙ্গাপুরে ২০ থেকে ২৩ জুন ১০টি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করেছে জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

জ্বালানি বিভাগ বলেছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী ২১ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওই সময় পর্যন্ত ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত চুক্তি না হলে বিশ্ববাজারে আবার অস্থিরতা দেখা দেবে, তাই বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে।