দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম, ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মধ্যে এবার বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল শনিবার রাতে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা এবং পেট্রলের দাম ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নতুন দাম আজ রোববার থেকে কার্যকর হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রভাব ও দাম বৃদ্ধির কারণ
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে প্রভাব ফেলে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যুদ্ধের আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে। গত শুক্রবার ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে দাম ৯০ ডলারে নেমে আসে, কিন্তু গতকাল আবার বন্ধের ঘোষণায় নতুন উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
২০২৪ সালের মার্চ থেকে সরকার বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ শুরু করে। প্রতি মাসে আমদানি খরচ বিবেচনায় দাম সমন্বয় করা হয়, তবে এবার এপ্রিলের শুরুতে দাম না বাড়িয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাড়ানো হয়েছে।
দাম বৃদ্ধির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা
দেশের ইতিহাসে এক লাফে সর্বোচ্চ মূল্য বৃদ্ধি হয়েছিল ২০২২ সালের আগস্টে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ডিজেলের দাম সাড়ে ৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৪ টাকা করা হয়েছিল। এবার ডিজেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ রেকর্ড। অকটেনের দাম ১২০ থেকে বেড়ে ১৪০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকায় পৌঁছেছে।
জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ নির্ধারণ করে, অন্যদিকে জেট ফুয়েল ও ফার্নেস তেলের দাম বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারণ করে।
সরবরাহ পরিস্থিতি ও উদ্যোগ
বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশনে ভিড় বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সরবরাহ বাড়িয়ে মানুষের ভোগান্তি কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। বিপিসির তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বাড়তি তেল সরবরাহ করতে গতকাল রাতেই তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দেশে ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৬৩ শতাংশ হলো ডিজেল। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পর সময়মতো জাহাজ আসতে না পারায় টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। গত মাসে ছয়টি ডিজেলের জাহাজ আসতে না পারায় দেড় লাখ টন ডিজেলের মজুত কমেছে। সরকার বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে এবং পুরোনো সরবরাহকারীরা সরবরাহ বাড়িয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন, আরও চারটি জাহাজে ১ লাখ টনের বেশি মজুত যুক্ত হচ্ছে। আজ থেকে ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৪৮ টন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ
দেশে অকটেন মজুত করার সক্ষমতা ৪৫ হাজার ৮১৯ টন। ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত মজুত আছে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন, যা ২৫ দিনের মজুত। গত শুক্রবার ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে, যা খালাস করা হলে মজুত সক্ষমতার বেশি হবে। পেট্রলপাম্প মালিকদের মতে, অকটেন ও পেট্রলের জন্যই মূলত মানুষ ভিড় করছে, তাই এগুলোর সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।
বিপিসির তথ্য বলছে, গত বছরের মার্চে দিনে গড়ে অকটেন সরবরাহ ছিল ১ হাজার ১৯৩ টন, এবার মার্চে তা বেড়ে ১ হাজার ২১৯ টন হয়েছে। আজ থেকে আরও ২৩৭ টন বাড়িয়ে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। পেট্রলের ক্ষেত্রে, বর্তমানে মজুত আছে ১৮ হাজার ৮৩০ টন, এবং আজ থেকে আরও ১৩৭ টন বাড়িয়ে সরবরাহ করা হবে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলেন, "সরবরাহ বাড়ানো ইতিবাচক, তবে শুধু এটি করে সমাধান হবে না। মানুষের মধ্যে তেল পাওয়া নিয়ে ভীতি আছে। ঢাকায় তেল সরবরাহের উৎস বাড়ানো, কিউআর কোড ব্যবহার করে প্রাপ্তির আওতা বাড়ানো এবং ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে হবে।"
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, "বাজারে অস্বাভাবিক চাহিদা দেখা যাচ্ছে, যা যৌক্তিক নয়। কিন্তু মানুষের কষ্ট হচ্ছে, তাই জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর কথা চিন্তা করা হচ্ছে।"



