রাজধানীতে তেলের জন্য দীর্ঘ ১১ ঘণ্টার লাইন: পাঠাও চালকের ঈদ যাত্রার মতো অভিজ্ঞতা
শনিবার রাত সাড়ে ১০টা। রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে যখন ইকবালের মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্কে তেল ভরা হচ্ছিল, তখন তার চোখেমুখে যে আভা দেখা গেল, তা কোনও বড় অর্জনের চেয়ে কম নয় বলেই মনে হলো। সকাল সাড়ে ১১টায় মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগিয়ে রাত সাড়ে ১০টায় পেলেন সেই কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি।
ইকবালের ক্লান্তি ও আনন্দের মিশ্রণ
তেল নেওয়ার পর ঘামভেজা শরীরে এক গাল হেসে ইকবাল বলেন, “ভাই, এই তেল নেওয়া তো ঈদ যাত্রার মতো! গত ঈদে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা যাইতে ২২ ঘণা লাগছিল, আজকে তেল নিতে সেই অভিজ্ঞতারই মনে হয় পুনরাবৃত্তি হইলো।” ইকবাল পেশায় পাঠাও চালক। অ্যাপের মাধ্যমে ৮০০ টাকার তেল পেয়েছেন তিনি। ১১ ঘণ্টার অসহ্য ক্লান্তি কি এক নিমিষেই দূর হয়ে গেলো? ইকবালের জবাব, “তেল পাওয়ার পর ক্লান্তি কিছুটা কমছে ঠিকই, কিন্তু আগের যন্ত্রণাটা ভোলার মতো না। রাস্তায় বসে আর কতক্ষণ থাকা যায়? কিন্তু উপায় তো নাই, তেল ছাড়া তো আর গাড়ি চলবে না, সংসারও চলবে না।”
শত শত বাইকার ও ড্রাইভারের দীর্ঘ অপেক্ষা
শুধু ইকবাল নন, ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে শুরু হওয়া তেলের লাইন মহাখালী বাস টার্মিনাল ছাড়িয়ে গেছে। শত শত বাইকার ও ড্রাইভার ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন এক ফোঁটা জ্বালানির জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে তেলের অপেক্ষায় বসে থাকতে দেখা গেলো সংবাদকর্মী আপেল মাহমুদকে। দুপুর ১২টায় মহাখালী রেলগেটে সিরিয়াল পেয়েছিলেন তিনি। রাত সাড়ে ১১টায় কথা বলার সময় তিনি পাম্পের কিছুটা কাছে পৌঁছাতে পেরেছেন। আপেল মাহমুদ বলেন, “আর তো কোনও উপায় নেই। দাঁড়িয়ে, বসে, কলা-রুটি খেয়েই অপেক্ষা করছি। আমার সামনে যে অবস্থা, তাতে আরও অন্তত দুই ঘণ্টা লাগবে।”
মঞ্জুর আলম ও হাসানের স্থবির অবস্থা
একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মঞ্জুর আলমের দীর্ঘশ্বাস যেন আরও ভারি। ১২ ঘণ্টার ওপর অপেক্ষা করছেন তিনি। ক্লান্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, “দুপুর গড়িয়ে রাত সাড়ে ১১টা বাজে। কলা-রুটি খেয়েই আছি। কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করি, আবার বাইকের ওপর বসি— এইভাবেই চলছে। দেখি তেলের দেখা কখন পাই।” বাইকারদের অবস্থা যদি হয় রোদে পোড়া, তবে প্রাইভেট কার চালকদের অবস্থা স্থবির। সকাল ১০টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত লাইনে থেকেও তেলের দেখা পাননি চালক হাসান। বিরক্তি নিয়ে তিনি বলেন, “গাড়ি তো আগায় না। গাড়ির ভেতরে ঘুমাইয়া এক জায়গাতেই দুই ঘণ্টা পার করছি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটু সামনে আসতে পারছি মাত্র, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা।” সোহেল রানা নামের আরেক চালকও ১১ ঘণ্টা পার করেছেন একই অনিশ্চয়তায়।
ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতাদের ব্যবসা জমে উঠেছে
তেলের এই দীর্ঘ লাইনকে কেন্দ্র করে পাম্প এলাকায় জমে উঠেছে ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতাদের ব্যবসা। রুটি, কলা, চা আর সিগারেট নিয়ে ঘুরছেন যুবক হাসান। তিনি জানালেন, আজ তার বিক্রি অন্য যেকোনও দিনের চেয়ে ভালো। হাসান বলেন, “রাতে ডিম খিচুড়ি আনছিলাম ৫০ টাকা প্লেট, তাও প্রায় শেষের পথে। মানুষ খাইতে খাইতে অপেক্ষা করতাছে।”
রাত যত বাড়ছে, ক্লান্তি তত জেঁকে বসছে
রাত যত বাড়ছে, তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে ক্লান্তি ততটাই জেঁকে বসছে। তবে যারা তেল নিয়ে পাম্প থেকে বের হচ্ছেন, তাদের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠছে অন্যরকম এক যুদ্ধ জয়ের আনন্দ। ১১ ঘণ্টার ক্লান্তি শেষে তেলের ট্যাঙ্ক পূর্ণ হওয়াটা এখন রাজধানীবাসীর কাছে এক অলীক সুখের নাম। এই দীর্ঘ অপেক্ষা শুধু সময়ের অপচয় নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শহরের সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হচ্ছে।



