চট্টগ্রামে ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত
চট্টগ্রামে ৬ বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত জনজীবন

চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট: ৬ কেন্দ্র বন্ধ, লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত

চট্টগ্রামে বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হওয়ায় জনজীবন চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ৬টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিদ্যুৎহীনতায় পানির সংকট ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত

বিদ্যুৎ না থাকায় বাসা-বাড়িতে ওয়াসার পানিও সংগ্রহ করা যাচ্ছে না বলে পানির সংকটে পড়েছেন নগরবাসী। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষিতে সেচ কার্যক্রম এবং শিল্প-কারখানায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

নগরীর চেয়ে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে মফস্বল বা উপজেলাগুলোতে। সেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ মিলছে না। চট্টগ্রামে বিদ্যুতের দৈনিক ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ, জ্বালানি সংকট প্রধান কারণ

চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে মোট ২৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ইতোমধ্যে ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো হলো:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-২ (৪৬ মেগাওয়াট)
  • কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-৩ (৫০ মেগাওয়াট)
  • কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট-৫ (৫০ মেগাওয়াট)
  • রাউজান-১ (২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতা)
  • রাউজান-২ (২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতা)
  • জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্র

জ্বালানি সংকট চলতে থাকলে সামনে আরও কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাসের চাপ কম থাকার পাশাপাশি জ্বালানি তেলের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বিশাল ব্যবধান

পিডিবির হিসাব অনুযায়ী (১৫ এপ্রিল) চট্টগ্রামে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা অফ পিক আওয়ারে ছিল ১৩৮৪ দশমিক ৯ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ১৪৩২ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট। ওইদিন অফ পিক আওয়ারে ১১১ দশমিক শূন্য ৯ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ১৭০ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। কাগজে-কলমে ১৭০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে লোডশেডিং ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।

বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পিক আওয়ার সাধারণত বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, যখন চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। অন্যদিকে, অফ-পিক আওয়ার হলো রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত। তখন বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কম থাকে।

শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ৩০ শতাংশ কমেছে

ভুক্তভোগীরা জানান, নগরীর পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ শিল্পাঞ্চলে গত কয়েকদিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুতের অভাবে বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

কালুরঘাট শিল্প এলাকায় অবস্থিত বিটিএল অ্যাপারেলস নামে একটি গার্মেন্ট কারখানার মালিক জালাল উদ্দিন বলেন, "তারা কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না। রোববারও তিন দফা লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে এলাকার শিল্প-কারখানাগুলো। বেশ কিছুদিন ধরে এই অবস্থা চলছে।"

উন্নয়ন কাজের অজুহাতে লোডশেডিং চালানো হচ্ছে

১৭ ও ১৮ এপ্রিল নগরীর প্রায় অর্ধেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের নোটিশ দেওয়া হয় একটি স্থানীয় দৈনিকে। 'উন্নয়ন, জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য নগরীর কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে'-উল্লেখ করে এই নোটিশ দেওয়া হলেও গ্রাহকরা বলছেন, এটা এক ধরনের চাতুরি। লোডশেডিংকে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে উন্নয়ন-মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের কথা বলে।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকায় চরম সংকট

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলার মানুষ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ। উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। পবিস-১ চট্টগ্রাম দক্ষিণের আট উপজেলা নিয়ে গঠিত। উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  1. পটিয়া
  2. বোয়ালখালী
  3. আনোয়ারা
  4. কর্ণফুলী
  5. বাঁশখালী
  6. চন্দনাইশ
  7. সাতকানিয়া
  8. লোহাগাড়া

দক্ষিণ চট্টগ্রামের আট উপজেলায় পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ৭ লাখের কাছাকাছি। অপরদিকে এই ৮ উপজেলায় পিডিবির গ্রাহক সংখ্যা লক্ষাধিক।

বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন বলেন, "২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ রয়েছে। এ কারণে চট্টগ্রামে চাহিদার চেয়ে বিদ্যুতের সরবরাহ কিছুটা কম। গত কয়েকদিন ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। অফ পিক আওয়ারে ১১১ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুতের লোডশেডিং হচ্ছে। পিক আওয়ারেও হচ্ছে। এছাড়া নগরীর কিছু কিছু এলাকায় উন্নয়ন, জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।"

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) বিদ্যুৎ সরবরাহ করে নগরীতে। আর বিভিন্ন উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)। পবিস-১ চট্টগ্রাম জেলার ৭টি জোনাল অফিস, ১টি সাব-জোনাল অফিস, ১টি এরিয়া অফিস এবং ২৩টি অভিযোগ কেন্দ্রের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সেবা প্রদান করে থাকে।