জ্বালানি তেলের জন্য পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা: রাজধানীতে দীর্ঘ সারিতে হতাশ চালকদের কষ্টের গল্প
জ্বালানি তেলের জন্য পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা: রাজধানীতে হতাশ চালক

জ্বালানি তেলের জন্য পাঁচ ঘণ্টার অপেক্ষা: রাজধানীতে দীর্ঘ সারিতে হতাশ চালকদের কষ্টের গল্প

রাজধানী ঢাকার আসাদ গেট এলাকার তালুকদার ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল নিতে এক পাশে গাড়ি, আরেক পাশে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। আজ মঙ্গলবার সকাল থেকেই এই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে শত শত চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মাত্র কয়েক লিটার তেলের জন্য।

আবদুর রহমানের পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা

সাভারের হেমায়েতপুরে বাস করা চালক আবদুর রহমান সকাল সাতটায় বাসা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘুরে বেলা তিনটায় আসাদ গেটে পৌঁছান। তিনি জানান, হেমায়েতপুরের লালন ও কফিল ফিলিং স্টেশন বন্ধ পেয়ে ঢাকার টেকনিক্যাল, মিরপুর ১০ ও মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের তিনটি পাম্পে যান, কিন্তু কোথাও তেল পাননি। বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখে আসাদ গেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে দাঁড়ান, যেখানে সকাল ১০টা থেকে টানা পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।

ক্ষোভ প্রকাশ করে আবদুর রহমান বলেন, ‘যদি তেল না থাকে, তাইলে সব গাড়ি বন্ধ কইরা দিক। এক হাজার টাকার তেল দেয়, ঘুরতে ঘুরতেই এক হাজার টাকার তেল শেষ।’ আগামীকাল সকালে বিমানবন্দর থেকে নোয়াখালীতে যাত্রী নিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর, কিন্তু তেল সংকটে এই পরিকল্পনা হুমকির মুখে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দীর্ঘ সারি ও চালকদের দুর্ভোগ

বেলা দেড়টার দিকে জিয়া উদ্যান–সংলগ্ন বিজয় সরণি মোড় থেকে তালুকদার ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক ব্যক্তিগত যানবাহন তেলের জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায়। মোটরসাইকেলচালকদের সারি পাম্পের সামনে থেকে গণভবন মোড় হয়ে লেক রোডের দিকে পৌনে এক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে তিন শতাধিক মোটরসাইকেলচালক অপেক্ষায় ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আবদুল কুদ্দুস নামের আরেক চালক ভোর চারটায় গাড়ি নিয়ে তেলের জন্য অপেক্ষায় দাঁড়ান, কিন্তু সকাল ছয়টায় তেল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তিনি রাস্তাতেই গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করতে থাকেন, দুপুরের খাবার মালিকের বাসা থেকে পাঠানো হয়। তাঁর কথায়, ‘এই দেশের জনগণেরে যে সরকার আয়ে সেই পেদায় খায়। মানে জনগণের কোনো দাম নাই, এইডা হইল বড় কথা।’

রাইড শেয়ার চালকদের আয় কমেছে

তেলসংকটের কারণে রাইড শেয়ারের চালকদের আয়রোজগার কমে গেছে বলে জানা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা সময় নষ্ট করছে এবং চালকদের ক্লান্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে খরচ কমাতে পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

জিয়াউর রহমান নামের এক রাইড শেয়ার চালক মোহাম্মদপুরে স্ত্রীকে নিয়ে থাকতেন, কিন্তু গত ৩০ মার্চ স্ত্রীকে গ্রামে পাঠিয়ে বাসা ছেড়ে মেসে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাসা নিয়ে ঢাকা থাকতাম। ঈদের পরও আমার ফ্যামিলিকে নিয়ে আসি। আবার ৩০ তারিখে বাড়িতে পাঠিয়ে দিসি।’

পয়লা বৈশাখেও ছুটি নেই

তেলসংকটের কারণে পয়লা বৈশাখের ছুটির দিনেও চালকদের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। প্রাইভেট কারের চালক মজিবর হক বলেন, ‘আজকে তো ছুটির দিন ছিল। কিন্তু গাড়িতে তেল নিতে হবে। তাই ছুটির দিনটাও এভাবে যাচ্ছে। আজ পয়লা বৈশাখের দিন। এখন কী করব? মালিকের দিকটাও দেখতে হয়।’ তিনি সকাল ছয়টায় লাইনে দাঁড়িয়ে ৯ ঘণ্টা পরও প্রায় ৫০টি গাড়ির পেছনে ছিলেন।

ফিলিং স্টেশনের অবস্থা

তালুকদার ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বিমল কৃঞ্চ মৃধা জানান, আজ তারা ৯ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল বিক্রি শুরু করেছেন, যা গতকালের ডিজেল। বাইকে ফুয়েল পাস যাঁদের আছে, তাঁদের ৭০০ টাকার এবং যাঁদের নেই, তাঁদের ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। প্রাইভেট কারে ১০০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা তেল দেওয়া হচ্ছে, এবং যতক্ষণ তেল আছে বিক্রি চলবে।

এই পরিস্থিতি রাজধানীবাসী ও চালকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব পড়ছে।