অকটেন সরবরাহ কমায় ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি, বাড়ছে জনদুর্ভোগ
বাংলাদেশে অকটেন জ্বালানি তেলের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি দেখা দিয়েছে। গত মাসের তুলনায় এপ্রিলে অকটেনের দৈনিক বিক্রি প্রায় ৮৩ টন কমেছে, যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়েও নিম্নমুখী। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি ক্রমাগত বাড়ছে, বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট গাড়ির মালিকরা প্রতিদিন তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।
বিপিসির তথ্যে সরবরাহ হ্রাসের চিত্র
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের মার্চে দৈনিক গড়ে ১,১৯৩ টন অকটেন বিক্রি হলেও এবারের মার্চে তা সামান্য বেড়ে ১,২১৯ টনে দাঁড়িয়েছে। তবে এপ্রিল মাসে এই বিক্রি কমে দৈনিক গড়ে ১,১৩৬ টনে নেমে এসেছে, যা গত বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৪৯ টন কম। বিশেষ করে ১১ এপ্রিল মাত্র ১,১৪৪ টন অকটেন বিক্রি হয়েছে, যদিও পরের দিন ১২ এপ্রিল তা বেড়ে ১,১৭৩ টনে পৌঁছেছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব ও ভীতির বাজার
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানে হামলা শুরু হলে তেল নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে মার্চের শুরুতে পেট্রল ও অকটেনের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। সরকার এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেশনিং চালু করলেও কয়েক দিন পর তা তুলে নেওয়া হয়। তবে বর্তমানে বিপিসি গত বছরের বিক্রির হার অনুসরণ করে সরবরাহ বরাদ্দ করছে, যা বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।
পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, "দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় কখনো এমন পরিস্থিতি দেখিনি। দেশে এত মোটরসাইকেলের উপস্থিতিও কল্পনায় ছিল না। মূলত পেট্রল ও অকটেনের জন্যই এই ভিড়, এবং এই দুটির সরবরাহ বাড়ানো হলে ভোগান্তি কমতে পারে।"
মজুত পর্যাপ্ত, কিন্তু সরবরাহে ঘাটতি
জ্বালানি বিভাগের তথ্যমতে, দেশে অকটেনের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। ১২ এপ্রিল পর্যন্ত অকটেনের মজুত ২০,১১৮ টন, যা প্রায় ১৭ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো। এছাড়া ৩০,০০০ টন অকটেন নিয়ে ১৭ এপ্রিল আরেকটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। দেশীয় উৎস থেকেও অকটেন উৎপাদন বাড়ছে, চারটি বেসরকারি শোধনাগার ও সরকারি গ্যাস কোম্পানির ফ্রাকসেনেশন প্ল্যান্ট থেকে নিয়মিত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
তবে বিপিসির দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পেট্রলপাম্পগুলি থেকে ৩০ শতাংশ বাড়তি চাহিদা আসলেও গত বছরের সমান পরিমাণ তেল দেওয়া হচ্ছে, ফলে অনেক পাম্প প্রতিদিন তেল পাচ্ছে না। তাঁরা মনে করেন, অকটেনের কোনো ঘাটতি নেই এবং সরকার চাইলেই সরবরাহ বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সমাধানের পথ
জ্বালানিবিশেষজ্ঞ ম তামিমের মতে, "বর্তমানে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বাড়তি চাহিদা রয়েছে, তাই সরবরাহ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ঢাকার সব পেট্রলপাম্পে তেল সরবরাহ করা উচিত, যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি পাম্পে ভিড় কমে। একই সঙ্গে প্রকৃত চাহিদা মূল্যায়ন করে সরবরাহ বাড়ানো জরুরি।"
পেট্রলপাম্প মালিক সমিতির আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম বলেন, পেট্রলপাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে এবং অনেক কর্মচারী চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। সম্প্রতি বিপিসির সঙ্গে এক বৈঠকে ব্যবসায়ীরা প্রস্তাব দেন যে, প্রয়োজনে পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়িয়ে সরবরাহ বাড়ানো হোক, যাতে ভোগান্তি কমে।
সরকারের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, "জ্বালানি তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই এবং মজুত আরও বাড়ানো হচ্ছে। তাই সরবরাহ কমার কথা নয়, এটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। তবে ভীতি থেকে কেনাকাটা না কমলে মানুষের ভোগান্তি কমবে না।"
গত অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ১৫ হাজার টন অকটেন বিক্রি হয়েছে, যার অর্ধেক দেশীয় উৎস থেকে এসেছে। এপ্রিল মাসে অকটেনের চাহিদা ৩৭,০০০ টন ধরা হলেও আমদানি ও দেশীয় উৎস থেকে মোট ৮৬,০০০ টন অকটেন যুক্ত হওয়ার কথা, যা ঘাটতির শঙ্কা দূর করে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানো না হলে ফিলিং স্টেশনের লাইন আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।



