মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির পরও জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, দাম কমলেও স্বস্তি মিলছে না
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় তা পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেল সংগ্রহের জন্য মোটরসাইকেল ও গাড়ির চালকদের দীর্ঘ লাইন এখনও দৃশ্যমান। বিজয় সরণি ও রাজধানীর মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে এই দৃশ্য দেখা গেছে।
এলএনজি আমদানিতে লোকসান ও দামের ওঠানামা
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর কাতার ও ওমান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ বন্ধ করেছে। আগামী ১৮ মে পর্যন্ত ওমান এবং ১২ মে পর্যন্ত কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণ দামে এলএনজি কিনছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার, কিন্তু এপ্রিলে গড়ে ২০ ডলারের বেশি দামে কেনা হয়েছে, সর্বোচ্চ ২৮.২৮ ডলার পর্যন্ত। এতে পেট্রোবাংলার লোকসান বেড়ে চলেছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর প্রথম দিনে প্রতি ইউনিট ১৭.৯৯ ডলারে এলএনজি কেনার দরপ্রস্তাব পাওয়া গেছে। যদি এই দামে ৮টি জাহাজ কেনা যায়, তাহলে সরকারের ১,৩২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। এপ্রিলে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। দাম কমার দিকে থাকলে মে মাসে এই ঘাটতি কিছুটা কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জ্বালানি তেলের বাজারেও অনিশ্চয়তা
জ্বালানি তেলের বাজারেও একই রকম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এক দশক ধরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে নিয়মিত মুনাফা করলেও, এখন দ্বিগুণের বেশি দামে আমদানি করতে হচ্ছে। এপ্রিলে দেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর ফলে বিপিসির এক মাসেই প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামেও ওঠানামা চলছে। যুদ্ধবিরতির খবরে ডিজেলের দাম ১৯০ ডলারে নেমে এলেও, গতকাল আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠেছে। অয়েলপ্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বুধবার ৯২ ডলারে নেমে এসেছিল, কিন্তু গতকাল ৫ ডলারের বেশি বেড়ে ৯৭ ডলারে পৌঁছেছে। যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ৭০ ডলার, যা একপর্যায়ে ১১৯ ডলারে উঠেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, "যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় বিশ্ববাজারে দাম কমার কারণে আশা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু গতকাল আবার অস্থিরতা দেখা গেছে। তাই সুফল পাওয়ার বিষয়ে এখনই কিছু বলা যাবে না। এটি বুঝতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।"
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, "যুদ্ধ থামলে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং দামও কমবে, তবে জ্বালানির দাম আগের জায়গায় যেতে সময় লাগবে। হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক চালু হতে পারে, যা আগামী কয়েক মাসে জ্বালানি আমদানিতে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার বাড়তি খরচ তৈরি করতে পারে। যুদ্ধ থেমে গেলেও এর রেশ থেকে যাবে, তবে মূল্যস্ফীতি বাড়ার গতি কিছুটা শ্লথ হতে পারে।"
এলএনজি থেকে দিনে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের অবকাঠামো থাকলেও, বর্তমানে গড়ে ৯৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। আগামী মাসে বাড়তি জাহাজ আমদানি হলে সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে দাম কমলেও জুনের আগে এর সুফল মিলবে না।
সামগ্রিকভাবে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির পর জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসলেও, পুরোপুরি স্থিতিশীলতা ফিরতে আরও সময় লাগবে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন, এবং দাম কমলে আমদানি খরচ কমানো, ডলার সাশ্রয় ও ভর্তুকির চাপ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে।



