জ্বালানি বিতরণে ডিজিটাল বিপ্লব: ‘ফুয়েল পাশ’ অ্যাপের মাধ্যমে কিউআর কোডে তেল নেওয়ার সুযোগ
জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা আনতে মোবাইল অ্যাপভিত্তিক নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ‘ফুয়েল পাশ’ নামের এই অ্যাপটি পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর দুটি ফিলিং স্টেশনে চালু করা হয়েছে, যেখানে কিউআর কোড স্ক্যান করে জ্বালানি নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কেন চালু হলো ‘ফুয়েল পাশ’?
বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জ্বালানি বিতরণের কারণে নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ যানজট ও লাইন তৈরি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করছেন, যা কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিজিটাল ব্যবস্থা হিসেবে ‘ফুয়েল পাশ’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পুরো বিতরণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় হবে এবং তাত্ক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
কিভাবে কাজ করবে এই ব্যবস্থা?
‘ফুয়েল পাশ’ ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যবহারকারীর জন্য একটি অনন্য কিউআর কোড তৈরি হবে। ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় এই কোড স্ক্যান করলেই নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি সংগ্রহ করা যাবে। ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিজিটাল পদ্ধতিতে জ্বালানির বরাদ্দ নথিভুক্ত করবেন, আর চালকরা কিউআর কোড স্ক্যান করে নিজেদের বরাদ্দ দেখতে ও জ্বালানি গ্রহণ করতে পারবেন। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে পুরো দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি তাত্ক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা যাবে এই পদ্ধতিতে।
এছাড়া, যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে কিউআর কোড ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে ব্যবহার করতে পারবেন। নতুন এই ব্যবস্থাটি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, ফলে যানবাহনভিত্তিক তথ্য যাচাই সহজ হবে এবং জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রাথমিক পর্যায় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের উদ্যোগে তৈরি এই অ্যাপটি প্রথম পর্যায়ে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের সোনারবাংলা ফিলিং স্টেশনে এটি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে বড় আকারে দেশব্যাপী এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। জ্বালানি বিভাগ আশা করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম ও অপচয় কমবে এবং সংকটের সময় কার্যকর ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে।
জ্বালানি সংকট ও অভিযান সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য
জ্বালানি বিভাগের যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী গত বুধবারের অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছেন যে, দেশে ৩৬১টি অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুতকৃত ১,৩৬২ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১৯২টি মামলায় ২ জনকে কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫০ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ৩ মার্চ থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৭,৩৪২টি অভিযান চালিয়ে অবৈধ মজুতকৃত ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪২ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়, যেখানে ৩,০১১টি মামলা হয়েছে, ৩৬ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং ১ কোটি ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, ডিজেলের কোনো সংকট নেই; গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১ লাখ ৪৩ হাজার ১৪৩ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত আছে। পেট্রোল ১৬ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন এবং অকটেন ৯ হাজার ৫৬৯ টন মজুত রয়েছে। তবে প্যানিক বায়িং এখনো বন্ধ হয়নি, যার প্রভাব ফিলিং স্টেশনগুলোতে পড়ছে। সরকার যথা নিয়মে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল সরবরাহ করছে এবং আগামী দুই মাসের জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে, তাই কোনো জ্বালানির সংকট হবে না বলে দাবি করা হয়েছে।



