খুলনায় জ্বালানি তেল সংকট: মোটরসাইকেল সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস
খুলনার জ্বালানি তেল বাজারে বর্তমানে এক অরাজক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। পেট্রোলপাম্পগুলোতে সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর কিলোমিটারজুড়ে লম্বা লাইনের নেপথ্যে সক্রিয় রয়েছে শক্তিশালী মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট। এই চক্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রকাশ্যেই সাধারণ চালকদের পকেট কাটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নগরীর পাম্পগুলোতে পেট্রোল ও অকটেনের হাহাকার চললেও অলিগলিতে চড়া দামে মিলছে ড্রামভর্তি তেল। একই মোটরসাইকেল বারবার বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে, যার ফলে প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী তেল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পাম্প মালিকদের।
সিন্ডিকেটের কার্যক্রম: পেশাদার তেল সংগ্রহকারীদের দৌরাত্ম্য
রোববার সরেজমিন খুলনার বিভিন্ন পেট্রোলপাম্প ঘুরে দেখা গেছে, বেলা ১১টায় তেল দেওয়ার কথা থাকলেও ভোররাত থেকেই মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। এই সারির বড় একটি অংশই পেশাদার ‘তেল সংগ্রহকারী’। সিন্ডিকেট সদস্যরা একবার তেল নেওয়ার পর দ্রুত দূরে সরে গিয়ে তা ড্রামে ঢালছেন এবং পুনরায় অন্য পাম্পে বা একই পাম্পে পোশাক পরিবর্তন করে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। তারা ৩০০ টাকার তেল বারবার নিয়ে মজুত করছেন এবং পরে লিটারপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা বেশি দামে খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন। অনেক পাম্পে মোটরসাইকেলের জ্বালানি রাখার পর সংকটের ভয়ে সাধারণ চালকরাও বারবার লাইনে দাঁড়াচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সম্প্রতি এমন ঘটনা বুঝতে পেরে খুলনার এলেনা পেট্রোলপাম্প কর্তৃপক্ষ তেল বিক্রির সময় বাইকের টায়ারে রং দিয়ে চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বাইকচালকরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য আশপাশের অন্য পেট্রোলপাম্পে গিয়ে সিরিয়াল দিয়ে পুনরায় তেল ভরছেন। এই চক্রের দৌরাত্ম্য শুধু পাম্পের লাইনেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক অসাধু ব্যবসায়ী পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও সাধারণ গ্রাহককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।
প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও জরিমানা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সম্প্রতি ফুলতলা উপজেলার মেসার্স নওশিন এন্টারপ্রাইজ নামের একটি পেট্রোলপাম্পে জরিমানা করেছে র্যাব-৬। এছাড়া নগরীর বাইপাস সড়কে কাকন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রির সময় পরিমাপে কম দেওয়ার অভিযোগে খুলনা জেলা প্রশাসন জরিমানা করেছে। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে ড্রামভর্তি তেল সংগ্রহ করে তা বাইরে চড়া দামে বিক্রির অভিযোগ মিলেছে। সম্প্রতি বন বিভাগের স্টিমারের জন্য পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে সেটি উচ্চমূল্যে নগরীর লবণচরা এলাকায় বিক্রির সময় প্রশাসনের কাছে ধরা পড়েছে।
একাধিক পেট্রোলপাম্প শ্রমিক তাদের অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করে বলেছেন, "মোটরসাইকেল চালকরাই এই সংকটের মূল কারিগর। একই মানুষ দিনে দশবার তেল নিচ্ছে। কেউ যদি একবারের বেশি তেল না পেতেন, তবে প্রকৃত চালকরা বঞ্চিত হতেন না।"
তেলের সরবরাহ ও ডিজিটাল সমাধানের প্রস্তাব
খুলনার পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ডিপোর তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় তেলের সরবরাহ খুব একটা কমেনি। তবে বর্তমানে বাজারে চাহিদা কয়েকগুণ বেশি দেখানো হচ্ছে। রেশনিং পদ্ধতিতে ডিলার ও এজেন্টদের তেল দেওয়া হলেও খুচরা পর্যায়ে গিয়ে তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। এই নৈরাজ্য রুখতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবে কেন্দ্রীয় একটি সফটওয়্যার বা অ্যাপ চালুর কথা বলা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নম্বর অনুযায়ী তেলের পরিমাণ ও সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাবে। এতে একজন চালক একবার তেল নিলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে দেশের আর কোনো পাম্প থেকে তেল নিতে পারবেন না।
বাংলাদেশ ট্যাংক লরি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (খুলনা বিভাগ ও বৃহত্তর ফরিদপুর জেলা) সাধারণ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ পিন্টু বলেন, "বর্তমান সংকটটি যতটা না সরবরাহের, তার চেয়ে বেশি অব্যবস্থাপনার। মোটরসাইকেল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে থাকবেন। অবিলম্বে অ্যাপভিত্তিক বণ্টন ব্যবস্থা এবং তেল দেওয়ার সময় রেজিস্ট্রেশন ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হলে এই কালোবাজারি থামানো সম্ভব।"
খুলনার জ্বালানি তেল বাজারের এই অরাজকতা শুধু স্থানীয় পর্যায়েই সীমাবদ্ধ নেই; এটি সারাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে না এলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বাড়তে থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।



