জ্বালানি সংকটে অফিস ও দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত: কতটা ফলপ্রসূ?
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অফিস এবং দোকানপাট বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা সহায়ক—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ, যেমন শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান, জ্বালানি সংকট সামাল দিতে পূর্ণ দিনের ছুটি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে কর্মঘণ্টা কমানো হয়েছে। সরকারি তরফে দাবি করা হচ্ছে, দিনের আলোতে কাজ শেষ হলে আলো জ্বালানোর জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানিও বাঁচবে। তবে এতে কতটা বিদ্যুৎ বাঁচানো যাবে, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট তথ্য জানানো হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: সীমিত প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রতিদিন একঘণ্টা অফিস সময় কমানো হলেও কর্মীদের সপ্তাহে পাঁচদিনই অফিসে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে যাতায়াতের জ্বালানি খরচে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে না। দোকানপাট, বিশেষ করে বড় বিপণিবিতানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে তারা মনে করছেন। বিপণিবিতান খোলা থাকলে বিক্রয়কর্মী ও ক্রেতা—উভয়েই আসবেন। এই দুই ক্ষেত্রে পুরো দিন বন্ধ রাখা যায় কিনা, সে বিষয়ে সরকারের চিন্তা করা উচিত বলে মত দিচ্ছেন তারা।
দক্ষিণ এশিয়ার উদাহরণ: শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান
জ্বালানি সংকটে শ্রীলঙ্কা সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিন থেকে বাড়িয়ে তিন দিন করেছে। পাকিস্তানও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান সরকার জ্বালানির দাম ব্যাপকভাবে বাড়ানোর পর, ইসলামাবাদসহ জনবহুল প্রদেশগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালিত গণপরিবহনে ভ্রমণ এক মাসের জন্য বিনামূল্যে করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ে আরও কার্যকর হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
বিপণিবিতানের বিদ্যুৎ ব্যবহার: সময়ভেদে পার্থক্য নেই
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত রাজধানীর বড় বিপণিবিতান বেলা ১১টা থেকে খোলা হয় এবং বিরতিহীনভাবে রাত ৮টা পর্যন্ত মোট ৯ ঘণ্টা চলে। বিপণিবিতানের ভেতরে কাচঘেরা কক্ষগুলোতে প্রচুর কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা থাকে এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও চালানো হয়। দিন বা রাত—সময়ভেদে বিপণিবিতানের বিদ্যুৎ ব্যবহারে তেমন কোন পার্থক্য হয় না। মার্কেট চালু থাকলে এই পরিমাণ লোডের প্রয়োজন হবেই, কিন্তু বন্ধ থাকলে লোড কম দরকার হবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হিসাব: সম্ভাবনা ও বাস্তবতা
বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ধরা যাক কোনও একটি বিপণিবিতানের লোড ৮ মেগাওয়াট—অর্থাৎ প্রতিদিন চলতে ওই বিপণিবিতানকে প্রতি ঘণ্টায় ৮ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। যদি একঘণ্টা বন্ধ থাকে, তাহলে প্রতি ঘণ্টায় সেটি ৮ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে পারে। আর যদি দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে, তাহলে ১৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। যদি মার্কেটটি ৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকে, তাহলে ১৪৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে।
সরকার এখন রাত ৮টার পরিবর্তে বিপণিবিতান বন্ধের সময় কমিয়ে ৬টা করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাসের কারণে মানুষ হঠাৎ করে ৮টার পরিবর্তে ৬টায় মার্কেট ছাড়তে চাইবে না। দেখা যায়, দোকানপাট ৮টায় বন্ধ করার কথা থাকলেও স্বাভাবিক সময়ে সাড়ে ৮টার পর দোকান বন্ধ করতে শুরু করে। আর সম্পূর্ণ বিপণিবিতান বন্ধ হতে আরও ৩০ মিনিট থেকে একঘণ্টা সময় লাগে। এখন বন্ধের প্রক্রিয়া ৬টায় শুরু হলেও তা শেষ করতে আরও এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগবে। ফলে জ্বালানি সাশ্রয় কিছুটা হলেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে না।
বিকল্প পদক্ষেপ: সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো ও অনলাইন কাজ
এর চেয়ে সংকটকালীন সময়ে সাপ্তাহিক বন্ধ এক দিনের পরিবর্তে দুই দিন করা সম্ভব হলে সরকার যেভাবে জ্বালানি সাশ্রয় করতে চাইছে, তা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। একইসঙ্গে বিপণিবিতানে একদিন ক্রেতা-বিক্রেতার যাতায়াত কমবে, ফলে যাতায়াতের জ্বালানি খরচও কমবে। অপরদিকে সরকারি অফিস-আদালতের ক্ষেত্রে কর্মঘণ্টা কমানোর পরিবর্তে সাপ্তাহিক ছুটি এক দিন বাড়ানো যায় কিনা, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত। একইসঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি মিটিংয়ে উপস্থিত না হয়ে জুমে মিটিং করার মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় করা যেতে পারে।
ধরুন, কোনও একটি জেলায় ৫টি উপজেলা রয়েছে। এসব উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কর্মরত থাকেন। তাদের প্রায়ই জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বৈঠকে যেতে হয়। জ্বালানি সংকটের এই সময়ে বৈঠকগুলো অনলাইনে করা সম্ভব হলে কর্মকর্তাদের আর সরাসরি উপস্থিত হতে হবে না। ফলে জ্বালানির সাশ্রয় হবে। একইভাবে সংকটকালীন সময়ে অনলাইনের ওপর গুরুত্ব দিলে বিষয়টি আরও ফলপ্রসূ হতে পারে।
আলোকসজ্জা কমানোর নির্দেশনা: এলইডি বাতির প্রভাব
সরকার আলোকসজ্জা কমানোর নির্দেশনা জারি করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন উৎসবে আলোকসজ্জার বড় অংশ সরকারি দফতরই করে থাকে। এছাড়া এখন বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানেও আলোকসজ্জা করা হয়। তবে বর্তমানে এলইডি বাতি ব্যবহারের ফলে বিদ্যুতের খরচ অনেকটাই কমে এসেছে। তারপরও সংকটকালীন সময়ে তা পুরোপুরি বন্ধ রাখা যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত: পরিকল্পিত পদক্ষেপের আহ্বান
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “জ্বালানি পুড়িয়ে অফিসে গেলে লাভ কী? বরং শ্রীলঙ্কার মতো সাপ্তাহিক বন্ধ একদিন বেশি দিলে সমস্যা কোথায়?” তিনি মনে করেন, সাশ্রয় করতে হলে পরিকল্পনা করেই করতে হবে। ইচ্ছামতো কিছু ঘোষণা দেওয়ার আগে কীভাবে বেশি সাশ্রয় সম্ভব, সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে।
পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বি. ডি. রহমত উল্লাহ বলেন, “এখন যা করা হয়েছে, তাতে ৫০০ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট সাশ্রয় হবে। কিন্তু যেহেতু সংকট চলছে, তাই কীভাবে আরও বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব, সে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আমাদের কাজও করতে হবে, আবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও করতে হবে। সবদিক বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে আরও বেশি বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়।”
ডিপিডিসির কর্মকর্তার অভিমত: বাস্তবিক চ্যালেঞ্জ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিপিডিসির এক কর্মকর্তা জানান, রাত ৮টায় মার্কেট বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হলেও আসলে সেটি বন্ধ হতে হতে ১০টা বেজে যায়। সে হিসাবে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যদি সন্ধ্যা ৬টায় শপিং সেন্টারগুলো বন্ধ করা হয়—তাহলে ডিপিডিসির এলাকায় ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, যা অঙ্কের হিসাবে প্রায় গড়ে ৯০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট। এই বাস্তবিক চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় নিয়ে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তিনি মত দেন।



