মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট: গ্রীষ্মের আগেই শুরু লোডশেডিং
জ্বালানি সংকটে গ্রীষ্মের আগেই লোডশেডিং শুরু

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট: গ্রীষ্মের আগেই শুরু লোডশেডিং

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাস ও কয়লার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানির অভাবে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এতে গ্রীষ্মকাল আসার আগেই দেশজুড়ে লোডশেডিং শুরু হয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও চাহিদার বর্তমান চিত্র

বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল সংস্থা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি পিএলসি (পিজিসিবি) সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমে সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত শনিবার সরকারি ছুটির দিনে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় প্রায় ৭০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। ঢাকা শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

জ্বালানি খাতে সংকটের মূল কারণ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতে পুরোনো দায় হিসেবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা বকেয়া শোধের চাপে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানির আমদানি খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করে মাত্র এক মাসেই সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে। ভর্তুকির চাপ সামলাতে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কথা ভাবছে অর্থ মন্ত্রণালয়। দ্বিগুণ দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি

ভারতের ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করার পরিকল্পনা থাকলেও কয়লার সরবরাহ নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। পিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ চাহিদার সময় কয়লার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৪৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের হিসাব করা হয়েছে ভারতের আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। বর্তমানে কারিগরি ত্রুটির কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রেখেছে আদানি। গতকাল তারা মাত্র ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পেরেছে।

পিডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেছেন, "কয়লার সরবরাহ জটিলতায় আগামী এক সপ্তাহ লোডশেডিং থাকতে পারে। কয়লা থেকে উৎপাদন বাড়লে লোডশেডিং কমে আসবে। তবে বৃষ্টি হলে বিদ্যুতের চাহিদা কমায় স্বস্তি আসতে পারে।"

গ্যাস সরবরাহে মারাত্মক সংকট

বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে গড়ে মাত্র ২৬৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হলেও তা পিডিবির চাহিদার তুলনায় অনেক কম। পিডিবি বলছে, গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে দিনে কমপক্ষে ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে হবে। সর্বোচ্চ চাহিদার সময় গ্যাসের সরবরাহ ৯০ কোটি ঘনফুট হলে ১ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হবে। এতে সারা দেশে গড়ে দুই ঘণ্টার মতো লোডশেডিং করতে হতে পারে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের উৎপাদন নিয়মিত কমছে। তাই চাইলেও বিদ্যুৎ খাতে সরবরাহ খুব বেশি বাড়ানো যাবে না। এই মৌসুমে সর্বোচ্চ ৯৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হতে পারে। এতে ৫ হাজার ২২৫ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে পিডিবি। যদিও গ্যাস থেকে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

সরকারের জ্বালানি সাশ্রয়ী পদক্ষেপ

লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়তেই থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুই মাসে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সর্বোচ্চ চাহিদার সময় দোকান ও বিপণিবিতান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার নিয়ন্ত্রণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

মন্ত্রীর বক্তব্য

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, "বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের মধ্যেও বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে হঠাৎ বন্ধ হওয়ায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। দেশীয় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে কয়লার সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। লোডশেডিং সহনীয় রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।"

ভোক্তা অধিকার সংগঠনের মূল্যায়ন

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেছেন, "জ্বালানি খাতের সংকট সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্ত হয়েছে। জ্বালানি কেনার সক্ষমতা না থাকলে জ্বালানি নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা ভর্তুকি নয়, বরং লুণ্ঠনমূলক ব্যয় কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয় করতে হবে।"

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও বলছেন, ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার মধ্যে গ্যাসচালিত প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট বসে থাকবে। ডিজেল ও সৌর মিলে দেড় হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা রাতের বেলায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বন্ধ থাকে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে থাকবে অন্তত দেড় হাজার মেগাওয়াট। তার মানে ১৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে হবে। এসব কেন্দ্রে জ্বালানি না রাখতে পারলেই কয়েক ঘণ্টা লোডশেডিং দিতে হতে পারে।