জ্বালানি সংকটে অফিস ও ব্যাংকের সময়সূচিতে পরিবর্তন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বাস্তবায়িত হচ্ছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আজ রোববার থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অফিসের কার্যক্রম সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত চলবে। পূর্বে স্বাভাবিক সময়ে অফিস সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত চালু থাকত।
সরকারি ও বেসরকারি অফিসের নতুন সময়সূচি
গত শনিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, দেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি অফিস রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি বলবৎ থাকবে। তবে জরুরি পরিষেবাগুলো এই নতুন সময়সূচির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
জরুরি পরিষেবার মধ্যে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহ, ফায়ার সার্ভিস, বন্দর কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা কাজ, টেলিফোন ও ইন্টারনেট সেবা, ডাকসেবা এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহন ও কর্মী, হাসপাতাল, চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও কর্মী, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বহনকারী যানবাহন এবং গণমাধ্যম অন্তর্ভুক্ত। আদালতের সময়সূচি নির্ধারণে সুপ্রিম কোর্ট প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন, আর বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দেশনা প্রদান করবে।
ব্যাংক লেনদেনের সময়সীমা হ্রাস
অফিস সময়সূচি পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আজ থেকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর লেনদেনের সময়সীমা এক ঘণ্টা কমিয়ে দিয়েছে। নতুন নির্দেশনা অনুসারে, ব্যাংক অফিস সকাল দশটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকবে, কিন্তু লেনদেন সকাল দশটা থেকে বেলা তিনটা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক ছুটি আগের মতোই বলবৎ থাকবে।
উল্লেখ্য, সমুদ্র, স্থল ও বিমানবন্দর এলাকার ব্যাংক শাখা, উপশাখা এবং বুথ আগের মতো ২৪ ঘণ্টা চালু থাকার নির্দেশনা বলবৎ রয়েছে। এছাড়া, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জরুরি সেবা ব্যতীত সকল বিপণিবিতান, অফিস ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সন্ধ্যা ছয়টায় বন্ধ করতে হবে।
শিক্ষা খাতে সম্ভাব্য পরিবর্তন
জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে শিক্ষা খাতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুযায়ী, আপাতত সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীর পাঠদান করা হতে পারে। এই প্রস্তাবে জোড়-বিজোড় পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে, অর্থাৎ এক দিন অনলাইনে ক্লাস হলে পরের দিন সশরীর ক্লাস নেওয়া হবে। অনলাইন ক্লাসের সময়ও শিক্ষকরা সশরীর উপস্থিত থেকে পাঠদান করবেন এবং ব্যবহারিক ক্লাস সশরীরেই অনুষ্ঠিত হবে।
তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে শিক্ষকরা মত প্রকাশ করেছেন। ঢাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উল্লেখ করেন, অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র ও শ্রমজীবী পরিবার থেকে আসায় তাদের অনলাইন ক্লাসে অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই বিষয়টি স্বীকার করে সমাধানের চেষ্টা করছে।
পূর্ববর্তী পদক্ষেপ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
২০২২ সালের নভেম্বরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস সময় সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত করা হয়েছিল, যা দীর্ঘদিন পর ২০২৪ সালের জুনে স্বাভাবিক সময়ে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে আবারও অফিস সময় এক ঘণ্টা কমানো হলো। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে, যার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশেও পড়ছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গত ২৯ মার্চ প্রায় ৪০ দিনের ছুটির পর খোলা হয়েছে, এবং এখন জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আংশিক অনলাইন পাঠদানের প্রস্তাব সামনে এসেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রস্তাব উপস্থাপন করবে বলে জানানো হয়েছে।



