জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের জরুরি আমদানি সিদ্ধান্ত
দেশের জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সরকার কাজাখস্তান থেকে ১ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল এবং সিঙ্গাপুর থেকে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আজ শনিবার ছুটির দিনে সচিবালয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনলাইনে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনার ফলে ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আগাম প্রস্তুতি হিসেবে জ্বালানি মজুত বাড়ানো জরুরি বিবেচনা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এই বিবেচনায় ছুটির দিনে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।
কাজাখস্তান থেকে ডিজেল আমদানির বিস্তারিত
কাজাখস্তানের প্রতিষ্ঠান কাজাখ গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ১ লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হবে। এই আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৭৬০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৮৯ কোটি টাকার বেশি। প্রতি ব্যারেল ডিজেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৫ দশমিক শূন্য ৬ ডলার, যা টন হিসাবে ৫৬০ মার্কিন ডলার পড়ছে। জ্বালানি বিভাগের মতে, এই দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় ক্রয় কমিটির অনুমোদনের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সিঙ্গাপুর থেকে এলএনজি আমদানি
সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেডের কাছ থেকে দুই কার্গো এলএনজি আমদানি করা হবে। প্রতিটি কার্গোতে ৩৩ লাখ ৬০ হাজার মিলিয়ন মেট্রিক ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি থাকবে। আরামকো থেকে এলএনজি আনতে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম পড়বে ১৯ ডলারের কিছু বেশি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই দুই কার্গো এলএনজি কিনতে প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
নিয়মিত উৎসে সমস্যা ও নতুন উৎসের সন্ধান
ক্রয় কমিটিকে জানানো হয়েছে যে ইউনিপ্যাক সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড এবং পেটকো ট্রেডিং লাবোয়ান কোম্পানি লিমিটেড নামের দুটি কোম্পানি এপ্রিল মাসে নির্ধারিত তেল সরবরাহে অপারগতা প্রকাশ করেছে। জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের হামলার কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক নৌপথে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো তাদের রপ্তানি সীমিত করেছে, তাই নিয়মিত উৎসের ব্যতিক্রম হিসেবে নতুন উৎসের সন্ধান করা হচ্ছে।
অন্যান্য প্রস্তাব ও কমিটির সিদ্ধান্ত
ক্রয় কমিটির বৈঠকের আগে ওমানভিত্তিক ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও এক লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগতভাবে অনুমোদন দিলেও ক্রয় কমিটি এই প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি। এলএনজি আমদানির প্রস্তাবটি নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে ছিল না, তবে জরুরি ভিত্তিতে টেবিলে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সরকারের এই জরুরি পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই আমদানি সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।



