বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: সরবরাহ অনিশ্চয়তা ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: সরবরাহ অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট: সরবরাহ অনিশ্চয়তা ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজেল, গ্যাস এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। তবে এই সংকটকে অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা ভুল হবে, কারণ অতীতেও জ্বালানির মজুত এক সপ্তাহের নিচে নেমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পার্থক্য হলো, তখন নতুন চালান সময়মতো আসার পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। বর্তমানে মূল উদ্বেগের জায়গা হলো নতুন চালান সময়মতো আসা নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা।

ডিজেল সরবরাহের ঝুঁকি ও অর্থনৈতিক প্রভাব

যদি নির্ধারিত সময়ে জ্বালানির চালান আসে, তাহলে বড় ধরনের সংকটের শঙ্কা কম। কিন্তু যদি সরবরাহে বিলম্ব হয়, বিশেষ করে ডিজেল খাতে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে। পেট্রল ও অকটেনের ক্ষেত্রে মজুত পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও, দেশে মাসে প্রায় চার লাখ টন ডিজেল প্রয়োজন হয়। যদি এক থেকে দেড় লাখ টনের ঘাটতি তৈরি হয়, তাহলে কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ সীমিত করা ছাড়া উপায় থাকবে না।

অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা

সংকট মোকাবিলায় অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। যাত্রী পরিবহনের তুলনায় পণ্য পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, এই তিন খাত সরাসরি অর্থনীতির চাকা সচল রাখে। শিল্পে জ্বালানি না থাকলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে, পণ্য পরিবহন বন্ধ হলে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং কৃষিতে ডিজেলের ঘাটতি হলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গ্যাস ও এলএনজির জটিল পরিস্থিতি

গ্যাস ও এলএনজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। আগে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে মোট চাহিদার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ এলএনজি পাওয়া যেত। এখন সেই সরবরাহ সীমিত হয়ে যাওয়ায় সরকারকে ‘স্পট মার্কেট’ থেকে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে ১০–১১ ডলারে এলএনজি পাওয়া যেত, এখন সেখানে ২১–২২ ডলার পর্যন্ত দাম দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ গ্যাস আমদানির খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে গ্যাস সরবরাহও এখন ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ভর্তুকির স্থায়িত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব

এখানে বড় প্রশ্ন হলো, কত দিন এই ভর্তুকি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব? যদি বৈশ্বিক সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যুদ্ধ থেমে গেলেও সরবরাহব্যবস্থা দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে উঠবে না। মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে অফিস সময় কমানো, দোকানপাটের সময় সীমিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বন্ধ রাখা এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নত দেশগুলোও একই ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

জনগণকে বাস্তব পরিস্থিতি জানানো

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণকে বাস্তব পরিস্থিতি জানানো। সংকটের সময় মিথ্যা আশ্বাসের চেয়ে পরিস্থিতি তুলে ধরা বেশি কার্যকর। এতে জনগণ সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকে এবং সরকারের প্রতিও বিশ্বাস বাড়ে। জ্বালানিসংকট একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা, যার জন্য অনেক উন্নত দেশও প্রস্তুত ছিল না। ফলে এ পরিস্থিতিতে আতঙ্ক নয়; বরং বাস্তবতা মেনে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগোনোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের প্রধান কাজ ও ভারসাম্য

জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকারের সামনে তিনটি প্রধান কাজ রয়েছে—সরবরাহ নিশ্চিত করা, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থাপনা করা ও জ্বালানি সংরক্ষণে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। পাশাপাশি স্বচ্ছভাবে পরিস্থিতি তুলে ধরা এবং স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি।