লাইসেন্স সংকটে পিছিয়ে গেল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি লোডিং
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিংয়ের তারিখ পুনরায় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগামী ৭ এপ্রিলের পরিবর্তে অগ্নিনিরাপত্তা ইস্যুতে লাইসেন্স না পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন নিশ্চিত করেছেন।
অগ্নিনিরাপত্তা ইস্যুতে বাধা
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না মেলায় আটকে গেছে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম বা অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কিছু ক্রিটিক্যাল সমস্যা চিহ্নিত হওয়ায় লাইসেন্স প্রদান বিলম্বিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সবই ঠিক ছিল, কিন্তু এখন একটু ক্রিটিক্যাল সমস্যা দেখা দিয়েছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বলা হয়েছে। সেজন্য বেশি না, অল্প কয়েকদিনের জন্য জ্বালানি লোডিং শিফট করবে।’
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। রাশিয়া থেকে প্রায় দুই বছর আগে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম রড এসে পৌঁছেছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ৭ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের উদ্বোধন হবে।
এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণের কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের। তবে লাইসেন্স সংকটের কারণে এখন উদ্বোধনের তারিখ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকা
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান জানান, গত নভেম্বরে রূপপুর প্রকল্পে কমপ্রিহেনসিভ সেফটি সিস্টেম টেস্ট সম্পন্ন হয়েছিল। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, রাশিয়ার ভিও সেফটি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার বিশেষজ্ঞরা প্রকল্প পরিদর্শন করে ২৫৭টি অবজারভেশন চিহ্নিত করেছেন।
এসব অবজারভেশনের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে পুনঃপরীক্ষা এবং অতিরিক্ত এসেসমেন্ট করার জন্য বলা হয়েছে। ড. জাহেদুল হাসান আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আশা করছি কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সম্পন্ন হবে এবং তাড়াতাড়ি আমরা জ্বালানি লোডিংয়ের লাইসেন্স পেয়ে যাবো।’
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
প্রকল্প পরিচালক ড. কবীর হোসেন জানান, জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আমাদের কন্ডিশনাল লাইসেন্স দিবে; যদি আমাদের কোনো গ্যাপ থাকে। যেহেতু ওনারা রেগুলেটরি ইনডিপেনডেন্ট বডি, ওনাদের আরও কিছু অবজারভেশন আসছে। সেটা করতে আমাদের একটু সময় লাগবে।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘মূলত সমস্যা হয়েছে ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম-ফায়ার মেজারমেন্টে। ফায়ার ফাইটিং ডিপার্টমেন্টে ওনারা ফারদার ইন্সপেকশনে আসবেন। ফায়ার ইন্সপেকশন করবেন। প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হয়তো সময় লেগে যেতে পারে। তার জন্য জ্বালানি লোডিংয়ে তারিখ শিফট করতে হতে পারে। মনে হয় ৭ এপ্রিলে হয়তো করতে পারবো না।’
প্রকল্পের অর্থনৈতিক দিক
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে, যেখানে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। করোনা মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্প সূত্র অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৭ সালের প্রথম দিকে শুরু হওয়ার কথা। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ আগামী বছরের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হতে পারে। পুরো প্রকল্প ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।



