মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দেশে এই মুহূর্তে কত পরিমাণ তেল মজুদ রয়েছে এবং তা দিয়ে কতদিন চলবে—এমন প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

সরকারের দাবি বনাম মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট না থাকার দাবি করা হলেও 'তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে' এমন আতঙ্কে দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে যানবাহনের লাইন। জ্বালানি তেল নিয়ে গ্রাহক-বিক্রেতার মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও সংঘাতের অভিযোগ আসছে, পাশাপাশি অবৈধ মজুদ ঠেকাতে চলছে নিয়মিত অভিযান। সব মিলিয়ে জ্বালানি তেল নিয়ে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সারাদেশে।

জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ পরিস্থিতি

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৩১শে মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুদ রয়েছে এক লাখ ২৮ হাজার ৯৩৯ মেট্রিক টন। এছাড়া সাত হাজার ৯৪০ মেট্রিক টন অকটেন, ১১ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন পেট্রোল এবং ৪৪ হাজার ৬০৯ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুদ রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ডিজেলের গড় নিয়মিত চাহিদা প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ বর্তমান মজুদ থাকা ডিজেল দিয়ে প্রায় ১১ দিন চলবে। তবে এর মানে এই নয় যে জ্বালানি তেলের মজুদ সম্পূর্ণ ফুরিয়ে যাবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন করে আমদানি করা জ্বালানি তেলের চালান দেশে পৌঁছালে আবারও মজুদ বাড়বে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার মধ্যে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেলের পরিমাণই বেশি। বড় অংশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ আমদানির ওপরই নির্ভরশীল। সৌদি আরব কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখানে বড় ভরসা। এছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকেও বাংলাদেশে ডিজেল আমদানি করা হয়।

সরকারের পদক্ষেপ ও বক্তব্য

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানান, এই মুহূর্তে মাসভিত্তিক চাহিদা পূরণেই গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। গত বছরের এপ্রিলে দেশে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়েছিল, এই বছরের এপ্রিলেও একই পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

তিনি দাবি করেন, 'জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। ডিজেলে কোনো সংকট নেই, বরং পাচারের শঙ্কা থাকতে পারে, যা সরকার বিবেচনায় রেখেছে—সীমান্তে নির্দেশনা দেওয়া আছে।'

মাঠপর্যায়ের চিত্র

ঢাকার বংশাল এলাকার বাসিন্দা মোটরসাইকেল চালক আনিসুর রহমান তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, 'প্রায় দুই ঘণ্টা দাঁড়াইছি এক পাম্পের সামনে, পরে বলে তেল নাই। পরে আরেকটা পাম্পে আইসা অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া দুইশ টাকার তেল দিছে।' তার অভিযোগ, পাম্প থেকে তেল দিতে অনিয়ম করা হচ্ছে।

অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিকরা নিরাপত্তা চেয়েছেন সরকারের কাছে। তাদের দাবি, কোনো অনিয়ম না করেই অনেক সময় গ্রাহকদের আক্রোশের শিকার হচ্ছেন তারা। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের আদেশ-নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা।

সরকারের ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাশ্রয়ী ব্যবহারের পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংগ্রহের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। জ্বালানি তেলের মজুদ ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় দেশের পেট্রোল পাম্পগুলোতে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী:

  • ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ১১৬ জন
  • ঢাকার ১৩ জেলায় ৪৭৯ জন
  • চট্টগ্রামের ১১ জেলায় ৩৩০ জন
  • রাজশাহীর আট জেলায় ৩৪০ জন
  • খুলনার দশ জেলায় ৩০১ জন কর্মকর্তা ট্যাগ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন

অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

জ্বালানি তেল মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র। ৩০শে মার্চ একদিনে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সারাদেশে ৩৯১টি অভিযান চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে ১৯১টি মামলা করা হয়েছে, প্রায় দশ লাখ টাকা জরিমানা এবং তিন জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল, সাড়ে ছয় হাজার লিটার অকটেন এবং প্রায় ১৪ হাজার লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়।

আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও চুক্তি

জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল সাধারণত দুইভাবে কেনা হয়—উৎস দেশের সঙ্গে সরকারিভাবে চুক্তির মাধ্যমে অথবা ওপেন টেন্ডারে স্পট মার্কেটের মাধ্যমে। 'ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো কয়েকটি দেশের সঙ্গে আমাদের চুক্তির মেয়াদ এখনো রয়েছে। এছাড়া আমেরিকা ও চীনের সঙ্গেও আমরা যোগাযোগ করছি জ্বালানি তেল আনার ব্যাপারে,' বলেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকা উচিত। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও নিয়মিত আমদানি ও ব্যবস্থাপনা পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।