রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু: মাইলফলকের দিকে এগিয়ে বাংলাদেশ
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে রূপপুর প্রকল্প আরো একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। কয়েক দফা বিলম্বের পর অবশেষে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোড করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী ৭ এপ্রিল থেকে এই কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।
জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া ও সময়সীমা
ফুয়েল লোডিং নামে পরিচিত এই প্রক্রিয়াটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এতে রিয়াক্টর প্রেসার ভেসেল বা চুল্লিপাত্রের ভেতরে ইউরেনিয়াম জ্বালানি সংযোজন করা হয়। রূপপুরের প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে, যা আগে থেকেই রাশিয়া থেকে আমদানি করে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে, তবে দক্ষ ব্যবস্থাপনায় ২১ দিনের মধ্যেও শেষ করা সম্ভব। এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানিয়েছেন, ফুয়েল লোডিংয়ের পর ফিশন বিক্রিয়া শুরু হয়ে তাপ উৎপাদন ও টারবাইন চালু করার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়মিত কমছে এবং দাম বাড়ছে। বাংলাদেশে ৭০ শতাংশের বেশি এলএনজি আমদানি কাতার থেকে হয়, যা দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ রাখলে দেশে গ্যাস-সংকটের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে অত্যন্ত সময়োপযোগী।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রাথমিকভাবে খুব কম মাত্রায়—প্রায় ১ শতাংশ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে, যা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ৪০ দিন সময় লাগবে, যার প্রতিটি ধাপে কঠোর পরীক্ষানিরীক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
গ্রিড প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) নিশ্চিত করেছে যে, রূপপুর থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য জাতীয় গ্রিড পুরোপুরি প্রস্তুত। প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সঞ্চালনে গ্রিডের ফ্রিকোয়েন্সি নির্ধারিত মান বজায় রাখা নিয়ে রুশ কর্তৃপক্ষ কিছু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর সঙ্গে চুক্তি করেছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ থেকে জ্বালানি সরবরাহ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া মনিটর করে। এছাড়া দেশে পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (BAERA) গঠন করা হয়েছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। IAEA-এর প্রতিবেদনগুলো এখন পর্যন্ত ইতিবাচক হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সময়সূচি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে নির্মিত হচ্ছে, যেখানে ২০১৩ সালে সমীক্ষা এবং ২০১৫ সালে নির্মাণ চুক্তি সম্পন্ন হয়। প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে শুরু হবে। দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ আগামী বছরের শেষ নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুরো প্রকল্প ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন হলে, রূপপুর থেকে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ফুয়েল লোডিংয়ের পর পূর্ণ সক্ষমতায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হতে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এই প্রকল্প পরিচালনা করবে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (NPCCBL), যাদের কর্মীবাহিনী রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ পেয়েছে।



