মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মধ্যেও চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজের অবিরাম আগমন
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে একের পর এক তেলবাহী জাহাজ ভিড়ছে। এই প্রবাহ দেশের জ্বালানি সরবরাহ চেইনে ইতিবাচক সংকেত দিলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিশেষ করে অকটেন জ্বালানির সংকট এখনও দৃশ্যমান।
নতুন জাহাজের আগমন ও জ্বালানি সরবরাহ
মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩০০ টন পরিশোধিত ডিজেল নিয়ে ট্যাংকার জাহাজ ‘পিভিটি সোলানা’ চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজটির মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করার কথা রয়েছে। পরে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে ডলফিন জেটিতে বার্থিং করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, ‘গত এক মাসে ৩০টি জাহাজ জ্বালানি তেল নিয়ে বন্দরে ভিড়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর ৩ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত এসব জাহাজ এসেছে। এর মধ্যে সব কয়টি জাহাজ ইতোমধ্যে জ্বালানি খালাস করে ফিরে গেছে। আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে আরও ছয়টি জাহাজ বন্দরে ভিড়বে।’ এই জাহাজগুলোর মধ্যে তিনটিতে এলএনজি, দুটিতে গ্যাস অয়েল এবং একটিতে এলপিজি আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অকটেন সংকট ও পাম্পে দীর্ঘ লাইন
চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজের ভিড় সত্ত্বেও পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে যানবাহনের চাপ কমছে না। অনেক পেট্রোল পাম্পে দিনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা জ্বালানি মিলছে। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে অকটেন জ্বালানিতে। নগরী ঘুরে দেখা গেছে:
- যেসব পেট্রোল পাম্প বা দোকানে তেল দেওয়া হচ্ছে সেগুলোর সামনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন
- বিশেষ করে মোটরসাইকেলের লাইন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে
- কোনও কোনও স্থানে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ
পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিভাগের সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে ডিজেলের কোনও সংকট নেই। তবে অকটেনের সংকট আছে। বর্তমানে পেট্রোল পাম্পগুলো চাহিদা অনুযায়ী অকটেন মিলছে না। তেল নিয়ে সংকট শুরুর পর অকটেনসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের চাহিদা হঠাৎ বেড়েছে। তবে সরবরাহ আগের মতোই আছে।’
অতিরিক্ত দামে বিক্রি ও প্রশাসনের অভিযান
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের অভিযানে এর সত্যতাও মিলেছে। জেলার রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে করিম স্টোর নামে একটি দোকানে ১২০ টাকার অকটেন ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ৯৮টি অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ১৮ থেকে ২০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। প্রশাসন বলছে, অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির বিরুদ্ধে এই অভিযান ভবিষ্যতেও জোরদারভাবে চলবে।
প্রশাসনের আশ্বাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, ‘দেশে জ্বালানির কোনও ঘাটতি নেই। এ পর্যন্ত প্রায় ১০টি জাহাজ এসেছে এবং সিঙ্গাপুর থেকে একটি জাহাজ রওনা হয়েছে, যাতে প্রায় ৩০ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। সেটি মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করবে। গত দুই দিনেও আরও দুটি জাহাজ থেকে তেল খালাস হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেল মজুত রয়েছে। তাই আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল নেওয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সংগ্রহ করুন। কেউ অতিরিক্ত মজুত করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম বন্দরে তেলবাহী জাহাজের এই অবিরাম আগমন জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি ইতিবাচক দিক। তবে স্থানীয় পর্যায়ে অকটেন সংকট ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন।



