চট্টগ্রামে জ্বালানি তেল সংকট: জনভোগান্তি চরম পর্যায়ে
চট্টগ্রামে জ্বালানি তেলের সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকের কাঙ্ক্ষিত তেল মিলছে না। পেট্রোলপাম্পে পাম্পে 'অকটেন নেই' বা 'তেল নেই' লেখা নোটিশ ঝুলছে, যা পরিস্থিতির তীব্রতা নির্দেশ করছে।
পুলিশ ও প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে জেলা পুলিশ ফিলিং স্টেশনগুলোতে বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তেল বিক্রিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পাশাপাশি, সার্বিক নজরদারি বাড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই অফিসাররা তেল বিক্রির কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন।
জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কোনো যানবাহনে তেল বিক্রি না করতে পেট্রোলপাম্প মালিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রোববার থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকদের ক্ষেত্রে হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও বৈধ কাগজপত্র না থাকলে অকটেন বিক্রি করা যাবে না বলে মাইকিং করা হচ্ছে। অন্যান্য যানবাহনের জন্যও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
সংকটের পেছনের কারণসমূহ
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়ার পর থেকে দেশের বাজারে তেল সংকট নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্রেতা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি কিনতে শুরু করলে গত ৬ মার্চ থেকে সরকার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রিতে সীমা নির্ধারণ করে। তবে ঈদ সামনে রেখে ১৪ মার্চ সেই রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হয়।
ঈদের আগে কয়েক দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও ২৩ মার্চ থেকে আবারও চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাম্পে তেলের সংকট দেখা দেয়। ফিলিং স্টেশন মালিকরা বলছেন, চাহিদার অর্ধেক জ্বালানি তেলও ডিপো থেকে পাওয়া যাচ্ছে না, যার ফলে রেশনিং পদ্ধতিতেই তেল বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া, ঈদের ছুটিতে ব্যাংকিং কার্যক্রম বন্ধ থাকায় অনেক ডিলার সময়মতো পে-অর্ডার করতে পারেননি, যা ডিপো থেকে তেল উত্তোলন বাধাগ্রস্ত করেছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংকটের চিত্র
নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে 'অকটেন নেই' লেখা বিজ্ঞপ্তি ঝুলছে। আবার কোনো কোনো ফিলিং স্টেশনে 'তেল নেই' নোটিশ দেওয়া হয়েছে। যেসব স্থানে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে মোটরসাইকেল ও রাইড-শেয়ার চালকদের অপেক্ষমাণ লাইন ক্রমেই দীর্ঘতর হচ্ছে।
- চকবাজার, বহদ্দারহাট, প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, ষোলশহর, লালখান বাজার ও সিআরবি মোড়সহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে একই চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।
- অনেক পেট্রোলপাম্প আগে দিনে-রাতে ২৪ ঘণ্টা তেল বিক্রি করলেও গত প্রায় ১৫ দিন ধরে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
- লালদীঘির পাড় সিরাজুল হক অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে সোমবার দুপুরে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে, কিন্তু বিকাল ৫টায় পাম্পটি বন্ধ হয়ে যায়। আগে এটি সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকত।
পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগে পেট্রোলপাম্প আছে ৩৮৩টি, এজেন্ট ডিস্ট্রিবিউটর আছেন ৭৯৯ জন, এবং প্যাকড পয়েন্ট ডিলার আছেন ২৫৫ জন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ফিলিং স্টেশন রয়েছে ৪৬টি, জেলায় রয়েছে শতাধিক। বেশ কয়েক দিন ধরে বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে অকটেন মিলছে না।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক জানিয়েছেন, ফিলিং স্টেশনগুলোতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে এবং তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। চাহিদার তুলনায় জ্বালানি সরবরাহ তলানিতে নেমে আসায় ঈদ-পরবর্তী সময়ে এই হাহাকার আরও তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।



