জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত, এপ্রিল মাসেও পর্যাপ্ত মজুত থাকবে
দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং আগামী এপ্রিল মাসেও চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত আমদানি করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল সোমবার রাজধানীর সচিবালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব মুনির হোসেন এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব এবং প্রয়োজনীয় ভর্তুকির পরিমাণ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
মূল্য সমন্বয় ও ভর্তুকি নিয়ে সরকারের পর্যালোচনা
মুনির হোসেন উল্লেখ করেন, গত রবিবার জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব জমা পড়েছে। এই প্রস্তাবে বর্তমান মূল্য অপরিবর্তিত রাখা, আংশিক বৃদ্ধি অথবা ভর্তুকি সমন্বয়সহ বিভিন্ন বিকল্প উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকার বর্তমানে এই প্রস্তাবটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে এবং অন্যান্য সম্ভাব্য ফ্যাক্টর ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়, তেল বিপণনকারী সংস্থা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েল গত সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব করেছে। এর আলোকে বিপিসি আগামী এপ্রিল মাসের জন্য ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল, কেরোসিন ও জেট ফুয়েলের মূল্য সমন্বয় এবং ভর্তুকি চাহিদার প্রস্তাব জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহেই সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও দেশের জ্বালানি চাহিদা
ব্রিফিংয়ে যুগ্মসচিব মুনির হোসেন বলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সরবরাহে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রতিদিন বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি পরিবহনে ব্যবহৃত হয়।
তিনি দেশের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশই ডিজেল, যার বর্তমানে কোনো ঘাটতি নেই। দেশে এখন প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন ডিজেলের উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে। মার্চ মাসে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ বজায় রাখা হয়েছে এবং ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৯ মার্চ পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন বেশি ছিল। অকটেনের ক্ষেত্রে ২২৫ মেট্রিক টন বেশি এবং পেট্রোলের ক্ষেত্রে ২৯ মেট্রিক টন কম সরবরাহ করা হয়েছে। জ্বালানি বিভাগের দাবি, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো সংকট নেই, তবে গ্রাহকদের একটি বড় অংশ আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করায় কিছু ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাস্তব চিত্র ও সরবরাহ চাপের কারণ
তবে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন বলে প্রতীয়মান হয়। রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে আগের তুলনায় তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৯ থেকে ১০ হাজার লিটার তেল সরবরাহ করা হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে তা কমে ৪ থেকে ৫ হাজার লিটারে নেমে এসেছে। কোনো কোনো পাম্প দিনে একটি ট্যাংকার পাচ্ছে, আবার কোথাও সেটিও মিলছে না।
সরকার এই পরিস্থিতিকে ‘চাহিদা সমন্বয়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও সরবরাহে চাপের একটি বড় কারণ হিসেবে কার্গো বিলম্ব উঠে এসেছে। ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, মার্চ মাসে দুটি অকটেন কার্গো ১০ হাজার ও ২৫ হাজার মেট্রিক টন নির্ধারিত সময়ে দেশে পৌঁছায়নি। পাশাপাশি প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টনের পাঁচটি ডিজেল কার্গো স্থগিত রয়েছে এবং আরো প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টনের সরবরাহ বিলম্বিত হয়েছে, যা বাজারে চাপ তৈরির অন্যতম কারণ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও আমদানি উদ্যোগ
পরিকল্পনা তুলে ধরে মুনির হোসেন জানান, ৩০ মার্চ ও ৩ এপ্রিল আসা দুটি কার্গো থেকে প্রায় ৫৪ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন জ্বালানি দেশে পৌঁছাবে। এছাড়া এনআরএল থেকে ৭ হাজার মেট্রিক টন এবং মালয়েশিয়ার পিএসপি, ইউনিপ্যাকসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এপ্রিল মাসে মোট প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টনের বেশি জ্বালানি যোগ হবে। তবে মে ও জুন মাসের সরবরাহ লাইন নিয়ে এখনো নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।
সরবরাহ শৃঙ্খল সচল ও পর্যাপ্ত বিতরণ নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এপ্রিল মাসে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে কূটনৈতিক যোগাযোগ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত থেকে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাওয়া গেছে এবং ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
ফুয়েল পাস ও নজরদারি ব্যবস্থা
চাহিদা নিয়ন্ত্রণে নতুন একটি উদ্যোগ হিসেবে ‘ফুয়েল পাস’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি অ্যাপ তৈরি করে ডিজিটালভাবে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনাও রয়েছে, যদিও এটি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিদিন জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে সমন্বয়সভা করা হচ্ছে এবং ভিজিল্যান্স টিম, ট্যাগ অফিসার ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ডিপো ও ফিলিং স্টেশন পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। গত ৭ থেকে ২৯ মার্চের অভিযানে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। অবৈধ মজুতদারির দায়ে ১ হাজার ৫৩টি মামলায় ১৬ জনকে কারাদণ্ড এবং প্রায় ৭৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে যে, জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট নেই এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ ও বিলম্বের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।



