মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট: সরকারের হোম অফিস ও ছুটি বাড়ানোর পরিকল্পনা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাব এখন বিশ্বজুড়েই অনুভূত হচ্ছে, এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে তেলের বাজারে অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের কারণে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীরা বেশ বেকায়দায় পড়েছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও তেল না পাওয়ার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে, যা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে হোম অফিস চালু এবং সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো অন্যতম।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তাবনা
জ্বালানি খাতে চাপ কমাতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাপ্তাহিক ছুটি বাড়ানো কিংবা হোম অফিস বা বাসা থেকে অফিসের কর্মসূচি চালুর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এখনো এ সংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পর সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানা গেছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ায় নতুন সরবরাহ কমে আসায় বিদ্যমান মজুত দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে।
একইসঙ্গে, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা অথবা বাসা থেকে অফিস (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) কর্মসূচি চালুর বিষয়েও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে জ্বালানি শক্তি সাশ্রয়ে আরো কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নিয়েও কাজ করা হচ্ছে। সূত্রমতে, পরিবহন খাতে জ্বালানির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আংশিকভাবে অনলাইন ক্লাস চালুর বিষয়টিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত কমিয়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
সরকারি নির্দেশনা ও কৃচ্ছ্রসাধনের পদক্ষেপ
জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায় খুঁজতে ইতিমধ্যে প্রতিটি সরকারি সংস্থাকে নিজস্ব সাশ্রয়ী প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে। আগামী মন্ত্রিসভা বৈঠকে এসব প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হবে, এবং সেখানে বিস্তারিত আলোচনার পরই সাপ্তাহিক ছুটি বা অফিসের সময়সূচি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবস্থায় জানান, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আরো কী করা যায়, তা নিয়ে সক্রিয়ভাবে চিন্তাভাবনা করছে। তিনি উল্লেখ করেন, হোম অফিসের পরিকল্পনা সাময়িক রুটিন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা ছুটি বাড়ানোর বিকল্প হতে পারে।
এদিকে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত রোববার সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ১১টি বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। মাঠ প্রশাসনের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত নিজ অফিস কক্ষে আবশ্যিকভাবে অবস্থান করতে হবে।
- দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং জানালা-দরজা খোলা রেখে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে।
- অফিস চলাকালে শুধু প্রয়োজনীয় সংখ্যক লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হবে, এবং এয়ার কন্ডিশনারের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার ওপরে রাখতে হবে।
- অফিস কক্ষ ত্যাগ করার সময় সকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বন্ধ করতে হবে, এবং অফিস সময় শেষ হওয়ার পর লাইট, ফ্যান, কম্পিউটার, প্রিন্টার, স্ক্যানার, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে।
- জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে এবং অফিস কক্ষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
এই নির্দেশনাগুলো প্রতিপালন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ব্যত্যয় পরিলক্ষিত হওয়ায় নতুন করে তা মেনে চলার অনুরোধ করা হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আগামী দিনগুলোতে আরো বিস্তৃত হতে পারে।



