জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ: মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার, সরবরাহ অনিশ্চয়তা অব্যাহত
জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ: বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার

জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ: মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করেছে। বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংস্থান ও আমদানি নিয়ে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের দেশগুলো থেকে জ্বালানি তেল আমদানির চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। তবে সরবরাহে ধাক্কা, বাজারে অস্থিরতা এবং তীব্র বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা—এই তিনটি চাপের কারণে সরকার শিগগিরই, বিশেষ করে আগামী এপ্রিল, মে ও জুন মাসে, জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইছে।

বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা ও চ্যালেঞ্জ

বিকল্প উৎসগুলো বাংলাদেশে রপ্তানির ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও শিগগিরই সরবরাহের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। এলএনজি ও এলপিজি আমদানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দেশে তেল ও গ্যাস আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা অপেক্ষাকৃত বেশি। অপরিশোধিত তেল এবং এলএনজির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। বেসরকারি কোম্পানিগুলোর এলপিজি আমদানির অর্ধেকের বেশি একই এলাকা থেকে আসে। যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি হয়ে জ্বালানি আমদানি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ইরান বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তার আশ্বাস দিলেও জ্বালানি স্থাপনায় ধারাবাহিক হামলার কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কোনো নিশ্চিত সময়সীমা নেই। বিভিন্ন উন্নত দেশও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিপিসির সরাসরি ক্রয় উদ্যোগ ও প্রাথমিক সাফল্য

জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে বিপিসি। সংস্থাটি ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠান আগ্রহ জানালেও অধিকাংশই শিগগিরই সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। এখন পর্যন্ত দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিশ্চিত সরবরাহের অনুমোদন মিলেছে। এপি এনার্জি ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড থেকে ১ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল এবং সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) থেকে ২ লাখ টন ডিজেল আমদানি করা হবে। প্রথমটি প্রতি ব্যারেলে তিন ডলার এবং দ্বিতীয়টি প্রতি টনে সর্বোচ্চ ৪০ ডলার ছাড় দেবে। তবে অন্যান্য প্রস্তাবগুলো এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ অ্যান্ড এ এনার্জি অয়েল অ্যান্ড গ্যাস কাজাখস্তান থেকে ২ লাখ টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তাব দিলেও চালান নিশ্চিত হয়নি। একইভাবে পেট্রোগ্যাস ইন্টারন্যাশনাল, বিজেএন গ্রুপ, আইএল টেক ভেনচারস এবং ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরবরাহ সূচি অনির্দিষ্ট।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২২ সালের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান উদ্বেগ

বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশ একই ধরনের বিকল্প উৎস খুঁজেছিল। তখন রাশিয়া থেকে তেল আমদানির আলোচনা ওঠে, কিন্তু দেশে সেই তেল পরিশোধনের সক্ষমতা না থাকায় সে আলোচনা আর এগোয়নি। বহু প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব দিলেও শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতেও সেই অভিজ্ঞতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। তবে এবার ব্যাপক পরিসরে আলোচনা চলায় দুই-তিনটি বিকল্প উৎস থেকে চাহিদার কিছুটা হলেও সরবরাহ পাওয়ার আভাস মিলছে।

কৌশলগত জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ

সরকার এখন কৌশলগতভাবে জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণের পথে হাঁটছে। কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়া থেকে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানির চিন্তা করা হচ্ছে। কাজাখস্তান ও নাইজেরিয়ার সঙ্গে সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কাজাখস্তানের বড় হাইড্রোকার্বন মজুত, স্থিতিশীল উত্পাদন এবং রপ্তানি সক্ষমতা রয়েছে। একইভাবে আফ্রিকার বৃহত্তম তেল উত্পাদক নাইজেরিয়ার সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। এ দুই দেশ থেকে আমদানিতে পরিবহন খরচ কিছুটা বেশি হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার কৌশল বাস্তবায়নে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এলপিজি ও এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা

দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। এর ৯৯ শতাংশ সরবরাহ করে বেসরকারি খাত। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে এলপিজি আমদানি প্রায় বন্ধ। যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে মাত্র একটি জাহাজ এসেছে ঐ অঞ্চল থেকে। ফলে বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার চেষ্টা করছে কোম্পানিগুলো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জাহাজভাড়া এবং প্রিমিয়াম বেড়ে গেছে, তাই বেশি মূল্যে এলপিজি আনতে হবে। দেশে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি গত দুই-তিন বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ এলপিজি আমদানি করছে। ঐ কোম্পানিগুলো ছাড়া বাকিরা আমদানি শিডিউলেও পিছিয়ে পড়ায় এপ্রিল ও মে মাসে দেশে এলপিজি আমদানিও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে বিপিসি এলপিজি আমদানির চেষ্টা করলেও গত প্রায় দুই মাসে সেটিও চূড়ান্ত করা যায়নি।

এলএনজি সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। দেশে দৈনিক প্রায় ৪৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুটের মতো। এর মধ্যে ৯০-৯৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি থেকে আসে। মার্চে এটি কমে ৮০-৮৫ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। এপ্রিল-মে মাসে এটি আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। যুদ্ধের আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলারের মতো থাকলেও তা এখন ২০-২৪ ডলারে ওঠানামা করছে। চলতি অর্থবছরে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও কাতার ও ওমান থেকে সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশ এখন অ্যাঙ্গোলা, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো নতুন উৎসের দিকে ঝুঁকছে। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, চলতি মাসে আটটি এলএনজিবাহী জাহাজ এসেছে। এপ্রিলে মোট ৯টি জাহাজ আসার সময়সূচি চূড়ান্ত হয়েছে। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকে। ফলে এপ্রিল পর্যন্ত বড় ধরনের ঘাটতি হবে না বলে আশা করা যায়।