জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ রোধে প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে নিয়োগ হচ্ছে ট্যাগ অফিসার
বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম তদারকি, সমন্বয় এবং জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি প্রতিরোধে সরকার একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে অর্থাৎ পেট্রোল পাম্পে 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক অনলাইন সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
ট্যাগ অফিসারদের বিস্তারিত কর্মপরিধি
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ট্যাগ অফিসারদের জন্য ১৩ দফা কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জ্বালানি খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে:
- ফিলিং স্টেশনের দৈনিক প্রারম্ভিক মজুদ সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত করা।
- ডিপো থেকে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেল স্ব স্ব ফিলিং স্টেশনে উপস্থিত হয়ে পরিমাপপূর্বক গ্রহণ করা এবং ফিলিং স্টেশনের পে-অর্ডার ও ডিপোর চালান বা রিসিটের সঙ্গে তেলের পরিমাণ মিলিয়ে দেখা।
- স্ব স্ব ফিলিং স্টেশনে ডিপ পোড বা ডিপ ইস্টিকের মাধ্যমে সরবরাহকৃত জ্বালানি তেল সঠিকভাবে বুঝে নেওয়া।
- ফিলিং স্টেশনে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রারে ডিপো থেকে দৈনিক জ্বালানি তেল গ্রহণের হিসাব লিপিবদ্ধ হয়েছে কিনা তা মনিটর করা।
- ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের দৈনিক মিটার রিডিং সংক্রান্ত রেজিস্ট্রার পর্যবেক্ষণ করে দৈনিক বিক্রয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।
- দৈনিক বিক্রয় শেষে ফিলিং স্টেশনের সমাপনী মজুদ সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা।
- ফিলিং স্টেশনের ডিসপেন্সিং মেশিনের পরিমাপ যথাযথ হচ্ছে কিনা তা নিয়মিত তদারকি করা।
- ফিলিং স্টেশন অনুমোদন প্রাপ্তির সময় বিস্ফোরক পরিদপ্তর হতে অনুমোদিত লে-আউট প্ল্যানে পণ্যভিত্তিক মজুদ ক্ষমতার তথ্য এবং বিদ্যমান মজুদ ক্ষমতার তথ্য যাচাই করা।
- ফিলিং স্টেশনের আশেপাশে অননুমোদিত কোন ট্যাংক বা স্থাপনা আছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।
- ডিপো থেকে পাম্প এবং পাম্প থেকে ভোক্তা সরবরাহ ব্যবস্থাকে দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
- প্রতিটি ডিপো, ট্যাংকার, পাম্প এবং খুচরা বিক্রির তথ্য একত্রে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রতিটি পাম্পে দিনে অন্তত তিন বার (সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা) স্টক আপডেট বাধ্যতামূলক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
- ডিপো থেকে জ্বালানি নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খুচরা বিক্রি শুরু না করলে তা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, জ্বালানি গ্রহণের এক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রি শুরু বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রথমবার সতর্কতা, দ্বিতীয়বার মোবাইল কোর্ট, তৃতীয়বার সাময়িক স্থগিতাদেশ ইত্যাদির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
- পাম্প খোলা আছে কিনা, স্টক রেজিস্টার সঠিক আছে কিনা, ডিসপ্লে বোর্ড আছে কিনা, ক্যাশ মেমো দেওয়া হচ্ছে কিনা, নির্ধারিত সীমা মানা হচ্ছে কিনা, কন্টেইনারে অবৈধ বিক্রি হচ্ছে কিনা, সারি ব্যবস্থাপনা কেমন—এসব বিষয় জিও-ট্যাগ প্রমাণসহ রিপোর্ট করা।
সরকারের এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য হলো জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা। ট্যাগ অফিসাররা ফিলিং স্টেশনগুলোর দৈনন্দিন কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটরিং করবেন, যা অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ভোক্তারা ন্যায্য মূল্যে ও সঠিক পরিমাণে জ্বালানি তেল পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। ট্যাগ অফিসার নিয়োগের মাধ্যমে ফিলিং স্টেশনগুলোর কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে।



