শরীয়তপুরে দুই দিন ধরে জ্বালানি তেল সংকট, যাত্রী-চালকদের মারাত্মক ভোগান্তি
শরীয়তপুর জেলার ছয়টি পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি তেল সরবরাহ না থাকায় দুই দিন ধরে বিক্রি বন্ধ রয়েছে। এই সংকটের কারণে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরা যাত্রী ও গণপরিবহনের চালকদের মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। শুক্রবার দুপুরে শহরের গ্লোরি ফিলিং স্টেশনে পেট্রলের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অসহায় যাত্রীদের।
চাকরি নিয়ে শঙ্কিত কর্মজীবীরা
শরীয়তপুর সদর উপজেলার সুবচনী এলাকার রায়হান কবির ঢাকার একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করেন। তিনি শুক্রবার সকালে মোটরসাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে ফেরার জন্য বের হলেও তিনটি ফিলিং স্টেশন ঘুরেও কোথাও জ্বালানি পাননি। রায়হান কবির বলেন, 'দুই দিন ধরে চেষ্টা করেও কোনো পাম্পে তেল পাচ্ছি না। বেসরকারি কোম্পানির কাজ, ঠিকঠাক মতো অফিসে যোগ না দিলে চাকরিটাই চলে যেতে পারে। যেকোনো উপায়ে আজকে ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। মোটরসাইকেলে তেল না ভরতে পারলে যাব কীভাবে?'
পরিবহন ব্যবস্থায় বিপর্যয়
ফিলিং স্টেশনের মালিক ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলায় ছয়টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সেগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার লিটার ডিজেল, ১৫ হাজার লিটার পেট্রল ও ১২ হাজার লিটার অকটেনের চাহিদা থাকে। বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম কোম্পানির ডিপো থেকে স্টেশনগুলোয় চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। এ কারণে গতকাল থেকে জেলার সব কটি স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পরিবহনশ্রমিকেরা জানান, শরীয়তপুর জেলা থেকে ঢাকায় তিন শতাধিক বাস চলাচল করে। বাসগুলো শরীয়তপুরের বিভিন্ন পাম্প থেকে ডিজেল নিয়ে যাত্রী পরিবহন করছে। গত দুই দিন ডিজেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় বাসগুলো চলাচল করতে মারাত্মক বিড়ম্বনায় পড়েছে।
বাসচালকদের হতাশা
ঢাকা-শরীয়তপুর পথের বাসচালক মোহাম্মদ মুন্না বলেন, 'শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় যেতে-আসতে আমার গাড়িতে ৫০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন। আগে পাম্পগুলো ২০ লিটার করে তেল দিত, তা দিয়েই দুই-একটি ট্রিপ দিতে পারতাম। গতকাল থেকে সবগুলো পাম্প তেল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বাস বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।'
যাত্রীদের দুর্বিষহ অবস্থা
নেত্রকোনার একটি সরকারি দপ্তরে চাকরি করেন ডামুড্যার মাসুদ খান। পরিবারের নারী ও শিশু সদস্যদের নিয়ে কর্মস্থলে ফেরার জন্য শরীয়তপুর পৌর বাস টার্মিনালে চার ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেও ঢাকায় যাওয়ার বাস পাচ্ছিলেন না। মাসুদ খান বলেন, 'চার ঘণ্টা ধরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাস টার্মিনালে দাঁড়িয়ে আছি। কোনো বাসে উঠতে পারছি না। তেলের সংকট থাকায় অনেক বাস চলতে পারছে না এমন বলছেন পরিবহন শ্রমিকেরা। আমার মতো হাজারো মানুষ এমন দুর্ভোগে পড়েছেন।'
পাম্প মালিকদের বক্তব্য
শরীয়তপুর শহরের মনোহর বাজার এলাকার হাজী আবদুল জলিল পেট্রোলপাম্পের পরিচালক খালেদ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, 'আমাদের পাম্পের চাহিদার ৩০-৪০ শতাংশ তেল সরবরাহ দিচ্ছে ডিপো। দুই দিন ধরে ডিপো থেকে তেল দিচ্ছে না। আমার পাম্পের জন্য তেল আনার গাড়ি দুই দিন ধরে ডিপোতে অপেক্ষা করছে, তেল পাওয়া গেলে তা দিয়ে পাম্প চালু করা হবে।'
সমাধানের আশা
শরীয়তপুর বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহম্মেদ তালুকদার বলেন, 'ঢাকা থেকে শরীয়তপুর আসার পথে পদ্মা সেতুর পর থেকে এক্সপ্রেসওয়েতে কোনো পেট্রল পাম্প চালু নেই। শরীয়তপুরের যে পাম্পগুলো আছে, তা থেকে তেল নিয়ে এ জেলার পরিবহনগুলো চলাচল করছে। তেল–সংকটে আমাদের বাসগুলো চলাচলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। দুপুরের পর পাম্পে তেল আসবে, এমন নিশ্চয়তা পেয়েছি। তখন হয়তো সমস্যা কিছুটা কেটে যাবে।'
জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় বাস ছাড়েনি বলে ভোগান্তিতে পড়েছেন গণপরিবহনের যাত্রী ও চালকেরা। বাস না পেয়ে শরীয়তপুর পৌর বাস টার্মিনালে যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে শুক্রবার দুপুরে। এই সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।



