মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: বাংলাদেশে তেল সরবরাহে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জ্বালানি সংকট: ব্যবস্থাপনার ঘাটতি

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট: ব্যবস্থাপনার ঘাটতি উদ্বেগজনক

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অভাবনীয় অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ঈদের দীর্ঘ ছুটির মধ্যে এবং গত মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পেট্রলপাম্পগুলোতে যে তীব্র তেলসংকট দেখা দিয়েছে, তা মূলত সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার ঘাটতির ফলেই হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন।

ঈদের ছুটিতে তেল সরবরাহে বিশৃঙ্খলা ও নাগরিক ভোগান্তি

কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে, আবার অনেক পেট্রলপাম্পে তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। এই পরিস্থিতিতে নাগরিকদের দৈনন্দিন ভোগান্তির পাশাপাশি জ্বালানি তেল নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তাও বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এই যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে।

আমরা মনে করি, শুধুমাত্র জ্বালানি খাত নয়, ইরান যুদ্ধের সম্ভাব্য অভিঘাত থেকে পুরো অর্থনীতিকে কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যাবে, তার জন্য সরকারের জরুরি প্রস্তুতি ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জ্বালানি মজুতের বর্তমান অবস্থা ও আমদানিতে অনিশ্চয়তা

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বরাত দিয়ে প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশে ডিজেলের বর্তমান মজুত দিয়ে প্রায় ১৪ দিন, অকটেন দিয়ে ৯ দিন এবং পেট্রোল দিয়ে ১১ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে জ্বালানি তেলের বিদ্যমান মজুত বিবেচনায় মার্চ মাসে বড় ধরনের জ্বালানিসংকট তৈরি হওয়ার বাস্তব কোনো কারণ নেই বলে দাবি করা হচ্ছে। সরকার বর্তমানে এপ্রিল মাসের আমদানিসূচি চূড়ান্ত করছে, কিন্তু যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের আমদানিসূচি এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় জ্বালানিবাহী জাহাজগুলো সময়মতো বন্দরে আসবে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা ভারত বা ভিয়েতনামের তুলনায় অনেকটাই কম বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। জ্বালানিবিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানির মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দিলেও বিগত সরকারগুলো তাতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়নি। ফলে দেশে বিদ্যমান মজুত সক্ষমতা স্বাভাবিক সময়ে সংকট তৈরি না করলেও যুদ্ধ, মহামারি বা অন্যান্য বিশেষ পরিস্থিতিতে দ্রুত সংকট দেখা দিতে পারে। চলমান সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে অবশ্যই জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপক পরিকল্পনা নিতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক প্রভাব

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালানোর পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে ও ইসরায়েলে পাল্টা হামলা শুরু করে। এই সংঘাতে দুই পক্ষই জ্বালানি তেল ও গ্যাস অবকাঠামোতে সরাসরি হামলা চালিয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিও বন্ধ রয়েছে। এ কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে প্রভাবিত করছে।

সরকারের পদক্ষেপ ও নাগরিক উদ্বেগ

এই সংঘাতের শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নীতি গ্রহণ করে এবং তেল কেনার ক্ষেত্রে রেশনিং পদ্ধতি চালু করে। তবে ঈদের ছুটির আগে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই নাগরিকদের মধ্যে জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এরপর আবার ঈদের ছুটির মধ্যে দুই দিন সরকারি ডিপো থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ ছিল। আবার ব্যাংক বন্ধ থাকায় অনেক ফিলিং স্টেশন পে–অর্ডার জমা দিতে না পারায় তেল কিনতে পারেনি বলে জানা গেছে।

জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের মধ্যে এমনিতেই উদ্বেগ ছিল। সে কারণে ঈদের দীর্ঘ ছুটির মধ্যে তেল সরবরাহের ব্যবস্থাপনা কী হবে, সেটা আগে থেকেই সঠিকভাবে ঠিক করা দরকার ছিল। কেননা বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে খুব স্বাভাবিকভাবেই নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্কের কেনাকাটা বেড়ে যায়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সরকারের বক্তব্য ও নাগরিক প্রত্যাশা

বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে জানিয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের প্রকৃত ঘাটতি নেই, অতিরিক্ত কেনাকাটার কারণেই চাহিদা বেড়েছে। তবে সরকারের এই বক্তব্যে নাগরিকেরা তখনই পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারবেন, যখন তেলের মজুত, আমদানি ও সরবরাহের প্রকৃত চিত্র তারা স্পষ্টভাবে জানতে পারবেন এবং তা দৃশ্যমান হবে।

ইরান যুদ্ধ যে অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাতে আপৎকালীন সংকট মোকাবিলার কৌশল প্রণয়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জরুরি খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। সংকটকে কাজে লাগিয়ে কেউ যেন মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি বাড়ানোও অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।