ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে ওঠানামা
মঙ্গলবার দিনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যা সরবরাহ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদ অনুযায়ী, ইরানের বক্তব্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। দেশটি জানিয়েছে, যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়নি, যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ববর্তী বক্তব্যের ঠিক উল্টো।
পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও বাজার অস্থিরতা
দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে, যা অনিবার্যভাবেই তেলের দামে প্রভাব ফেলবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জানান, সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে। তবে ইরান এ দাবি সরাসরি অস্বীকার করেছে, যা বাজারে আরও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
তেলের দাম ও শেয়ারবাজারের প্রবণতা
ট্রাম্পের বক্তব্যের পরপরই আন্তর্জাতিক বাজারে সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দ্রুত কমে যায়। সোমবার একপর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৩ ডলারে উঠে গিয়েছিল, কিন্তু ট্রাম্পের মন্তব্যের পর তা দ্রুত ৯৬ ডলারে নেমে আসে। যদিও পরে তেলের দাম আবার কিছুটা বেড়েছে, মঙ্গলবার সকালে এ প্রতিবেদন লেখার সময় তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১০৩ ডলার। অর্থাৎ গতকাল তেলের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় আজ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০ ডলার কম।
তেলের দাম কমার সঙ্গে শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা গেছে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক দিনের শুরুতে ২ শতাংশের বেশি পড়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থায় দিনের লেনদেন শেষ হয়। জার্মানির ড্যাক্স সূচক ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি সূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১ দশমিক ১ শতাংশের বেশি এবং ডাও জোন্স প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে।
এশিয়ার বাজারে প্রভাব
ট্রাম্পের এ বক্তব্যের আগেই এশিয়ার বাজার বন্ধ হয়ে যায়, যেখানে গতকাল বড় ধরনের পতন হয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোসপি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা তেল ও গ্যাসের ওপর তারা ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা
বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, চলমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জ্বালানি সংকটে পড়তে পারে বিশ্ব। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট এবং ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রভাবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইতিমধ্যে এ সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে, ফলে অনেক দেশে জ্বালানির ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া
বাজার বিশ্লেষকেরা বলছেন, ট্রাম্পের মন্তব্যে বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ওয়েলথ ক্লাবের বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, ইদানীং প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে আবার ভেঙেও যাচ্ছে, তাই এ ধরনের বক্তব্যের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর মতে, তেলের দাম এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা জ্বালানি ব্যয় নিয়ে চাপেই থাকবেন। সরবরাহপথে বিঘ্ন ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে যুদ্ধবিরতি হলেও শিগগিরই যে স্বাভাবিকতা ফিরবে, এমন সম্ভাবনা কম।



