ঈদের পরেও তেল সংকটের মাত্রা কমেনি, পাম্পে পাম্পে হাহাকার, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই
তেল সংকটে পাম্পে পাম্পে হাহাকার, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই

ঈদের পরেও তেল সংকটে পাম্পে পাম্পে হাহাকার, সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই

দেশে তেল নিয়ে সংকট যেন কাটছেই না। রেশনিং পদ্ধতি তুলে নেওয়া হলেও এখনও তেল পাচ্ছে না যানবাহন চালকেরা। পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেল থেকে শুরু করে যানবাহনের দীর্ঘ সারি লেগেই আছে। এমনকি, জ্বালানি সংকটের জেরে পেট্রোল পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। তবে, পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে একমত পোষণ করেনি সরকার। জ্বালানি মন্ত্রীর দাবি, জ্বালানি তেলের কোনও সংকট নেই। দু’দিন তেল সরবরাহ বন্ধ থাকায় কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় পরিস্থিতি: মাত্র তিনটি পাম্পে তেল বিক্রি

তবে, জ্বালানি মন্ত্রীর এমন মন্তব্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ পেট্রোলপাম্পে তেল নেই আজও সোমবার। ঢাকার বাইরের অবস্থা আরও করুণ। তেলের জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে।

ঈদের তৃতীয় দিন সোমবার (২৩ মার্চ) রাজধানীর নিউমার্কেট থেকে গাবতলী, মিরপুর থেকে কুড়িল, শাহবাগ থেকে জাহাঙ্গীর গেট, আসাদগেট, তালতলা, মহাখালী থেকে তেজগাঁও সাতরাস্তা ঘুরে মাত্র তিনটি পেট্রোলপাম্পে তেল বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। গাবতলীর মোহনা ফিলিং স্টেশন, মহাখালীর এস আর এন্টারপ্রাইজ এবং শেরাটনের উল্টোদিকের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে তেল বিক্রি করতে দেখা যায়। এ তিন পাম্পে অনেক লম্বা লাইন তৈরি হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে, ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেল আসেনি। বিকালে তেল আসতে পারে এ আশায় অনেকে বন্ধ পাম্পের সামনেই লাইন দিয়ে যানবাহন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন চালকেরা। সাইমন সরকার মেঘনা পেট্রোলপাম্পে তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘক্ষণ। জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বেশ কয়েকটা পাম্প ঘুরে অন্যদের কাছ থেকে শুনে এ পাম্পে এসেছি। জানি না শেষ পর্যন্ত তেল পাবো কি না। পেলেও দেখা যাবে যা দরকার তার চেয়ে কম দিচ্ছে। গত প্রায় ১৫ দিন ধরেই এ সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লাইনে থাকা প্রাইভেটকার চালক সালাম বলেন, “সরকার বলছে, তেলের সমস্যা নাই। কিন্তু, আমরা পাম্পে পাম্পে ঘুরে তেল পাচ্ছি না। আসলে সমস্যা কোথায়? তেল আসলে আছে নাকি নাই? তেল যদি থাকেই তাহলে আমাদের কে পাম্পে পাম্পে ঘুরা লাগবে। আর যদি তেল না থাকে সেটাও সরকারের উচিত পরিষ্কার করা।”

ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি: তেল সংকটে উত্তেজনা

বাংলা ট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, সেখানে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। জেলার ২০টি ফিলিং স্টেশনে তেল নেই। এর জেরে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। হাজার হাজার গ্রাহক তেল কিনতে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরে যাচ্ছেন। তেল সংকটে গ্রাহকদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এদিকে, ঠাকুরগাঁও জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত তেল পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। অধিকাংশ পাম্পেই ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ ঝুলছে। কোথাও সীমিত সরবরাহ এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক যানবাহন তেল না নিয়েই ফিরে যাচ্ছে। এ নিয়ে কোথাও কোথাও বাগবিতণ্ডা ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটছে। একই অবস্থা কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পগুলোরও।

পাম্প মালিকদের অভিযোগ: বরাদ্দে অসামঞ্জস্য

রাজশাহী বিভাগীয় পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, বাঘাবাড়িসহ বিভিন্ন ডিপো থেকে পেট্রোল ও অকটেনের যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ট্যাংক লরির নির্ধারিত ধারণক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাধারণত একটি লরির চেম্বার সাড়ে চার হাজার লিটার হলেও অনেক সময় দুই থেকে তিন হাজার লিটার সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে পাম্প মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

একইসঙ্গে মালিকরা তেল উত্তোলনে অনাগ্রহ দেখালে তা অন্য মাধ্যমে সরবরাহ হয়ে কালোবাজারে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ট্যাংক লরির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পাম্প মালিকরা যা বলছেন

পেট্রোল পাম্প ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি নাজমুল হক বলেন, “ঈদের দিন এবং ঈদের পরদিন তেল কোম্পানির ডিপোগুলো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। সোমবার সরবরাহ শুরু হলেও অনেক পাম্পেই এখনও তেল পৌঁছায়নি। বিকাল কিংবা সন্ধ্যা নাগাদ পাম্পে তেল পৌঁছে যাওয়ার কথা।”

অন্যদিকে, তেল সংকটের এ পরিস্থিতিতে পাম্পের নিরাপত্তা চেয়ে প্রশাসনের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, “বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ বেড়েছে। মোটরসাইকেল চালকসহ সাধারণ ভোক্তাদের ভিড় সামাল দিতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে কর্মীদের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে।”

এ অবস্থায় পাম্প সচল রাখতে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “প্রয়োজনে নিরাপত্তা বিবেচনায় মালিকদের নিজ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত, যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে।”

সরকার কি বলছে

দেশে জ্বালানি তেলের কোনও সংকট নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, “সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে এবং সবাই তেল পাবে। ঈদের কারণে দু’দিন সরবরাহ বন্ধ থাকায় সাময়িক চাপ তৈরি হলেও তা স্থায়ী কোনও সংকট নয়।”

সবাইকে ‘প্যানিক’ বা আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন তিনি বলেন, “ভর্তুকি দিয়েও গত বছরের তুলনায় পাঁচ শতাংশ বেশি তেল আমদানি করা হচ্ছে।”

প্রসঙ্গত, ইরান যুদ্ধের কারণে আতঙ্কিত লোকজন বেশি তেল কেনা শুরু করলে গত ৬ মার্চ রেশনিং করা হয়। পরে তেল কেনার পরিমাণ ২৫ শতাংশ রেশনিং থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। এরপর ঈদের ছুটির ঠিক আগে আগে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হয়নি। পাম্পগুলোতে আগের মতই তেল সংকট তীব্র আকার নিয়েছে।