উত্তরাঞ্চলে জ্বালানি সংকট: পেট্রল না পেয়ে ভোগান্তিতে মানুষ, পাম্পে দীর্ঘ লাইন
পেট্রল বিক্রির খবর শুনে মোটরসাইকেল চালকদের ভীড় জমেছে দিনাজপুর শহরের মর্ডান মোড় এলাকায়। সোমবার বিকেল সাড়ে চারটায় দেখা গেছে, আশরাফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি পঞ্চগড়ের ধনীপাড়া থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তিনি শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছেন, সঙ্গে রয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ে। মোটরসাইকেলের ট্যাংকে যতটুকু পেট্রল আছে, তা দিয়ে মাত্র দুই কিলোমিটার যাওয়া সম্ভব। ময়দানদিঘী এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে পেট্রল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন তিনি, কিন্তু জ্বালানি তেল না থাকায় পাম্পে বাঁশ ও দড়ি টানানো ছিল। পাম্পের এক কর্মচারী ইঙ্গিত করলেন যে পেট্রল নেই। আশরাফুল বলেন, ‘কী আর করার, বোদাবাজারে গিয়ে গাড়িটা রেখে অটোতে উঠে যেতে হবে।’
জ্বালানি তেলের সরবরাহে সংকট
ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ না থাকায় ঈদের পরদিন থেকে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরের মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। ফিলিং স্টেশন–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ডিপো থেকে চাহিদার বিপরীতে অর্ধেক পেট্রল পাওয়া যাচ্ছে, অকটেনের সরবরাহ বন্ধ। তবে ডিজেলের ক্ষেত্রে চাহিদার বিপরীতে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সরবরাহ মিলছে। তাঁরা আরও বলেন, জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে না পেরে গ্রাহকদের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। ঈদের আগের রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের হানিফ ফিলিং স্টেশনে উত্তেজিত গ্রাহকেরা ভবনের কাচ ভাঙচুর করেছেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ ও বিকল্প বিক্রি
অভিযোগ রয়েছে, পাম্পমালিকেরা তেল থাকলেও দিচ্ছেন না, দাম বাড়ার অপেক্ষায় মজুত করেছেন। সিন্ডিকেট করে খুচরা পাইকারদের তেল দেওয়া হচ্ছে। ছোট ছোট বাজারে তেল বিক্রি হচ্ছে প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। ঠাকুরগাঁওয়ের কচুবাড়ি এলাকায় দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাড়িওলিকে নিয়ে বিয়েবাড়িতে যাব। গাড়িত তেল নাই। বাড়ির পাশে কাউয়ারডাঙ্গা বাজারে একজন খোলা তেল বিক্রি করছে, দাম চাইল ৩০০ টাকা লিটার।’
পঞ্চগড় থেকে দিনাজপুর: পাম্প বন্ধ, লম্বা সারি
সোমবার দুপুর ১২টার দিকে পঞ্চগড় শহরের সিঅ্যান্ডবি মোড় থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে রওনা দেন এক প্রতিবেদক। দিনাজপুর শহরের মডার্ন মোড়ে পৌঁছান বিকেল চারটায়। পঞ্চগড়-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ৯৩ কিলোমিটারের ৪৬টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমানায় ২৫টি পাম্প বন্ধ, সেখানে অকটেন ও পেট্রল নেই। বীরগঞ্জ থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত ২১টি পাম্পের মধ্যে মাত্র ৩টিতে পেট্রল বিক্রি হচ্ছে, সেখানে গ্রাহকদের লম্বা সারি। কেউ মোটরসাইকেল নিয়ে, কেউ বোতল হাতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ভিড়ে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পের কর্মীরা, সিরিয়াল ভাঙতে দেখলেই হইহুল্লোড় শুরু হচ্ছে।
পেশাজীবীদের সমস্যা
ঠাকুরগাঁওয়ের জাফর আলী ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করছেন প্রকৌশলী মামুন রানা (৪৫)। তিনি বলেন, ‘কয়েকটা সাইটে কাজ চলতেছে। বাইকে তেল না থাকায় কোথাও দৌড়াতে পারছি না।’ মলয় চন্দ্র দাস নামের এক ব্যক্তি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন, তিনি বলেন, ‘গাড়িতে তেল নাই। মার্কেটেও যেতে পারছি না। ফোনে ফোনে ওষুধের অর্ডার নিয়েছি।’
ডিপো থেকে সরবরাহ কম
কয়েকটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ও কর্মচারী জানান, প্রতিটি লরিতে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের জন্য তিনটি চেম্বার থাকে, কিন্তু ডিপো থেকে শুধু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। পাম্পগুলোয় দৈনিক পেট্রলের চাহিদা ৭০০ থেকে দেড় হাজার লিটার, অকটেন ৩৫০ থেকে ৭০০ লিটার, আর ডিজেল দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার লিটার। ঈদের আগে অর্ধেক জ্বালানি পেয়েছেন তারা। ঠাকুরগাঁওয়ের চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বলেন, ‘গত শুক্রবার তেল পেয়েছি। আজ সাড়ে তিন হাজার লিটার পেট্রল পেলাম। রেশনিং পদ্ধতিতে দেওয়া ছাড়া উপায় নাই।’
সংকটের প্রভাব ও ভবিষ্যৎ
পঞ্চগড় ধাক্কামাড়া এলাকায় একটি পাম্পের কর্মচারী ফারুক আলম বলেন, ‘একটা অ্যাম্বুলেন্স যদি আসে, একফোঁটা জ্বালানি দিতে পারব না।’ পেট্রল-অকটেনের সংকট প্রকট হলেও ডিজেলের সরবরাহ অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক। নুরে আলম সিদ্দিক নামের এক ট্রাকচালক বলেন, ‘ডিজেলের সংকট এখন বোঝা যাবে না। ঈদ শেষ, এখন ট্রাকগুলো চলা শুরু করলে সংকট কতটা, তা বোঝা যাবে।’



