পৃথিবীর গভীরে তেলের উৎপত্তি ও ভান্ডার
পৃথিবীর গভীরে কোটি কোটি বছর ধরে তেলের বিশাল ভান্ডার গড়ে উঠেছে। প্রাচীনকালে মারা যাওয়া বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ বালি, পলি এবং পাথরের স্তরের নিচে চাপা পড়ে এই তেলের সৃষ্টি হয়েছে। মাটির গভীরে প্রচণ্ড তাপ ও চাপের প্রভাবে যুগ যুগ ধরে এই জৈব পদার্থগুলো ধীরে ধীরে তরল তেলে রূপান্তরিত হয়েছে। প্রায় ১৬৫ বছর আগে থেকে মানুষ এই তেল উত্তোলন শুরু করেছে, যা প্লাস্টিক, পেট্রোল এবং অ্যাসফল্টের মতো অত্যাবশ্যকীয় পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তেলের মজুতের বর্তমান অবস্থা
সমস্যা হলো, প্রাকৃতিক এই সম্পদ তৈরি হতে যতটা সময় লাগে, মানুষ তার চেয়ে অনেক দ্রুত তা ব্যবহার করে ফেলছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই তেলের মজুত কি একসময় শেষ হয়ে যাবে? সহজ উত্তর হলো, পৃথিবী থেকে তেল কখনোই পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে না। এর কারণ হলো, কিছু তেলের মজুত অ্যান্টার্কটিকার মতো অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। আবার কিছু তেল মাটির এত গভীরে রয়েছে যে সেগুলো খুঁজে বের করা বা উত্তোলন করা বর্তমান প্রযুক্তিতে প্রায় অসম্ভব।
যুক্তরাজ্যের অ্যাবারডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ডেভিড ম্যাকডোনাল্ডের মতে, বিশ্বের বেশির ভাগ তেল কোথায় আছে তা বিজ্ঞানীদের জানা রয়েছে। ২০২৩ সালের একটি জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল আছে, যা উত্তোলন করা সম্ভব। এর বাইরে আরও কিছু তেল থাকতে পারে, যা এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ২০১২ সালে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা অনুমান করেছিল যে এমন অজানা তেলের পরিমাণ প্রায় ৫৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল হতে পারে।
তেলের ভবিষ্যৎ ও প্রযুক্তির ভূমিকা
মানুষ এই উত্তোলনযোগ্য তেল আর কত দিন ব্যবহার করতে পারবে, তার উত্তরটি কিছুটা জটিল। কয়েক দশক ধরে বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন যে বর্তমান মজুতের ওপর ভিত্তি করে প্রায় ৫০ বছরের তেল অবশিষ্ট আছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত কয়েক বছর ধরে এই হিসাবটি প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। এর কারণ হলো তেল ফুরিয়ে যাওয়ার সময় হিসাব করার পদ্ধতি। বর্তমানে মাটির নিচে তেলের পরিচিত মজুত কতটুকু আছে, তাকে প্রতিবছর সারা বিশ্বে তেলের মোট চাহিদা দিয়ে ভাগ করে এই সময় বের করা হয়। আমরা প্রতি বছর যেমন নতুন নতুন তেলক্ষেত্র খুঁজে পাচ্ছি, তেমনি আমাদের ব্যবহারের হারও বাড়ছে। ফলে নতুন তেল পাওয়ার হার ও ব্যবহারের হার সমান হওয়ায় অবশিষ্ট সময়ের হিসাবটি খুব একটা বদলাচ্ছে না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ক্লিয়ারভিউর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেভিন বুক মনে করেন, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে মাটির নিচে তেলের সন্ধান করা আরও সহজ হবে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে এমন সব জায়গা থেকেও তেল তোলা সম্ভব হবে, যা আগে ছিল দুঃসাধ্য। এর ফলে ভবিষ্যতে আমাদের তেলের মজুতের হিসাব আরও বেড়ে যেতে পারে। জ্বালানি হিসেবে তেলের ব্যবহার এখনই ফুরিয়ে যাচ্ছে না।
চাহিদার পরিবর্তন ও পরিবেশগত প্রভাব
তেলের হিসাবের অন্য পাশে আরও একটি বড় বিষয় হলো ভবিষ্যতে এর চাহিদার পরিবর্তন। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপির ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্ব এখন তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অন্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তেলের চাহিদা একসময় স্থিতিশীল হয়ে পড়বে ও তারপর কমতে শুরু করবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা ২০২৩ সালে জানিয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে তেলের ব্যবহার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে ও এর পর থেকে ধীরে ধীরে তেলের চাহিদা কমতে থাকবে। এর মানে আমরা যদি তেলের ব্যবহার কমিয়ে দিই, তবে বর্তমানে যে তেলের মজুত আছে তা দিয়ে ৫০ বছরের বেশি সময় চলা সম্ভব হবে।
তেলের অভাবে পৃথিবী থমকে যাবে না বা তেল শিল্প এখনই ভেঙে পড়বে না। কারণ, মাটির নিচে এখনো প্রচুর তেলের মজুত রয়ে গেছে। বরং চাহিদার পরিবর্তন ও প্রযুক্তির উন্নয়নই তেলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। সূত্র: লাইভ সায়েন্স, ইন্টারেস্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং



