কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট: ২০টি পাম্প বন্ধ, গ্রাহকদের ক্ষোভ ও হামলার চেষ্টা
কুড়িগ্রামে তেল সংকট: ২০ পাম্প বন্ধ, গ্রাহক ক্ষুব্ধ

কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট: গ্রাহকদের ভোগান্তি চরমে

কুড়িগ্রাম জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা স্থানীয় জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জেলার মোট ২০টি ফিলিং স্টেশন বা পেট্রল পাম্প সম্পূর্ণ তেলশূন্য হয়ে পড়ায়, সেগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে হাজার হাজার গ্রাহক তেল কিনতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ফিরে যাচ্ছেন, তাদের ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

হামলার চেষ্টা ও পুলিশের তৎপরতা

তেল না পাওয়ায় উত্তেজিত গ্রাহকদের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। শহরের খলিলগঞ্জে অবস্থিত এসএস ফিলিং স্টেশনে কয়েকজন গ্রাহক উত্তেজিত হয়ে হামলার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে পুলিশের দ্রুত তৎপরতায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। রবিবার (২২ মার্চ) সন্ধ্যায় ওই পেট্রল পাম্পে পুলিশকে পাহারা দিতে দেখা গেছে, যা নিরাপত্তা জোরদারের ইঙ্গিত বহন করে।

পাম্প মালিকদের বক্তব্য ও রেশনিং সমস্যা

জেলার ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন দাবি করেছে যে, জেলায় অবস্থিত ২০টি ফিলিং স্টেশনের কোনটিতেই পেট্রল, ডিজেল কিংবা অকটেন—কোনো প্রকার জ্বালানি তেল নেই। ঈদের ছুটির আগেই এই তেলশূন্য অবস্থা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে রশি টেনে সেগুলো বন্ধ রাখার নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে। গ্রাহকরা সারাদিন ধরে তেল কিনতে গিয়ে ফেরত যাচ্ছেন, যা একটি নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাম্প মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, সরকার রেশনিং বন্ধের কথা বললেও বাস্তবে প্রত্যেক ফিলিং স্টেশনকে রেশনিং পদ্ধতিতে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্রাহক পর্যায়ে রেশনিং করে তেল বিক্রি করা হলেও, চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত সরবরাহ হওয়ায় দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঈদের ছুটিতে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে, এবং জেলার কোনো পাম্পেই তেল নেই বলে জানানো হয়েছে। ছুটি শেষে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সহসাই সংকট দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

গ্রাহক ও কৃষকদের প্রতিক্রিয়া

রবিবার বিকালে জেলা শহরের মোটরসাইকেল চালক আনিছুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনো পাম্পে তেল পাচ্ছি না। যেখানেই যাচ্ছি বলছে, তেল নাই। তাহলে আমরা কোথায় যাবো? তেল না পেলে এতোগুলো মানুষ কীভাবে তাদের প্রয়োজন মেটাবে?’ তার এই বক্তব্য সংকটের গভীরতা তুলে ধরে।

অন্যদিকে, জেলা সদরের বেলগাছা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘মাত্র বোরো আবাদ মাথা তুলছে। এই সময় যদি তেলের জন্যে মানুষ সেচ দিবার না পায় তাহলে কৃষকরা না খায়া মরবে। পাম্পত গেইলে কয় পেট্রলও নাই, ডিজেলও নাই। মানুষ তাইলে যাইবে কোটাই (কোথায়)।’ তার মন্তব্য কৃষি ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দাবি

ফুয়েল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জামান আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তেল না থাকায় মালিকরা জেলার পেট্রল পাম্পগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু গ্রাহকরা তেল না পেয়ে উত্তেজিত হচ্ছেন। তেল না থাকলে আমরা দেবো কীভাবে। কিন্তু কিছু গ্রাহক পাম্পের কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও হামলার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে মিটিং কল করেছি। সরকারের কাছে আমরা চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহের পাশাপাশি নিরাপত্তার দাবি জানাই। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবো।’ এই বক্তব্য পাম্প মালিকদের উদ্বেগ ও চাপের মাত্রা স্পষ্ট করে।

জেলা প্রশাসকের পদক্ষেপ

এ ব্যাপারে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পাম্প মালিকদের সঙ্গে মিটিং করেছি। তাদের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ চেয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান বরাবর পত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পেট্রল পাম্পগুলোর নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’ তার এই মন্তব্য সমস্যা সমাধানে প্রশাসনের সক্রিয়তা নির্দেশ করে, কিন্তু তাৎক্ষণিক ফলাফলের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সামগ্রিকভাবে, কুড়িগ্রামে জ্বালানি তেলের এই সংকট স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে, এবং দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।