মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে কাতারের এলএনজি উৎপাদন বন্ধ, বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও রপ্তানি স্থাপনায় আঘাত হানায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাপক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও ঘোরতর জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বাংলাদেশের মোট এলএনজি আমদানির ৭০ শতাংশের বেশি আসে কাতার থেকে, এবং যুদ্ধের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
এলএনজি সরবরাহে বড় ধাক্কা
জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ, শিল্প ও গৃহস্থালি খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির একটি বড় অংশ হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। দেশের মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি থেকে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ কমলে বা বন্ধ হলে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দেবে সব খাতে, যা রপ্তানিমুখী শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। এছাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস পেলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়তে পারে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, কিন্তু সরবরাহ করা হয় মাত্র ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে আসে ৯০ থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট, যদিও যুদ্ধ শুরুর পর এই সরবরাহ কমিয়ে ৮৫ কোটি ঘনফুটে নামানো হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৫৬টি কার্গো আসার কথা, এবং এর ৪০টিই কাতার থেকে সরবরাহ করার কথা ছিল।
কাতারের রাস লাফান কমপ্লেক্সে ক্ষয়ক্ষতি
কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই কমপ্লেক্স বিশ্বের মোট এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে এবং এশিয়া ও ইউরোপের বাজারে জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন যে, হামলায় স্থাপনাটির রপ্তানি সক্ষমতার ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পুনরুদ্ধার ও মেরামতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লাগতে পারে।
এছাড়া, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় কাতার থেকে এলএনজি রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপে এলএনজির পাইকারি দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে পেট্রোবাংলা সূত্র মতে, যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল ১০ ডলার, যা এখন বেড়ে ২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং আরও বাড়তে পারে।
বিকল্প উৎস সন্ধান ও সাশ্রয়ের আহ্বান
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) এর নির্দেশনায় এলএনজি আমদানি করে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে দাম কম থাকার সুযোগ নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সরবরাহ বন্ধ করা হতে পারে, তাই খোলাবাজার থেকে বেশি দামে কেনা এড়াতে জ্বালানি সাশ্রয় করা জরুরি। সরকারের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পেট্রোবাংলা বিকল্প উৎস হিসেবে মধ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলএনজি আমদানির চেষ্টা চালাচ্ছে।
এদিকে, জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানিনির্ভর, যার মধ্যে অপরিশোধিত জ্বালানির পুরোটাই আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে। যুদ্ধের শুরুতেই সৌদি আরবের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলা হওয়ায় অপরিশোধিত তেল আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র মতে, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল আমদানির জাহাজের সূচি পিছিয়ে যাচ্ছে, তবে বিকল্প উৎস থেকে তিন লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
সাবেক উপদেষ্টার পরামর্শ
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম তামিম সতর্ক করে বলেছেন, সিঙ্গাপুর থেকে আসা জ্বালানি তেলের সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে, কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্য থেকেই অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন যে, এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ব্যবহার সাশ্রয় করতে অফিসের সময় কমানো এবং প্রয়োজনে লোডশেডিং দেওয়া যেতে পারে।
২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও বাংলাদেশে এলএনজির দাম বেড়ে ৬০ ডলার ছাড়িয়েছিল, যা তখন দেশের জন্য ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। ওই সময় টানা ৭ মাস এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং দেখা দিয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনুরূপ সংকটের পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।



