মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে অস্থিরতা ক্রমেই বাড়ছে, যা সরাসরি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দেশটি এখন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এলএনজি সরবরাহে বড় সংকট
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তেল সরবরাহের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি নিয়েও বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে পড়তে শুরু করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে হামলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করেছে, কারণ এলএনজি আমদানিতে দেশটি অনেকাংশে কাতারের ওপর নির্ভরশীল। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দৈনিক প্রায় ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ১৭০-১৮০ কোটি ঘনফুট। বাকি ঘাটতি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়, যার বড় অংশই আসে কাতার থেকে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির প্রায় ৬০ শতাংশই কাতার থেকে আসে।
সরকারের পদক্ষেপ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকেও এলএনজি আমদানির চেষ্টা চলছে। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী টুকু বলেন, "এ সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বজুড়েই একই অবস্থা। আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি, তবে বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বাড়ছে।"
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এ সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে। তারা বলছেন, স্পট বাইং সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির বিকল্প উৎস নিশ্চিত করতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, "যুদ্ধ যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে তেল সংগ্রহের পাশাপাশি এলএনজি ও এলপিজি জোগান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।"
জানা গেছে, কাতারের রাস লাফান ও ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলার ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দামও বাড়ছে দ্রুত।
শিল্প খাতের ওপর প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধান
এ পরিস্থিতিতে শিল্প খাতেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, "গ্যাস সংকট হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে, যা শিল্প উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।" দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে তেল ও গ্যাস আমদানির জন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আপাতত দেশে মজুত জ্বালানি ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এছাড়া এলপিজি সরবরাহ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই বলেও সংশ্লিষ্টরা আশ্বস্ত করেছেন।



