ঈদে ঢাকার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি বিক্রির চিত্র: কিছুতে দীর্ঘ সারি, কিছুতে বিক্রি বন্ধ
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে ঢাকার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রির চিত্র মিশ্র দেখা গেছে। গত মঙ্গলবার থেকে ছুটি শুরু হওয়ায় যানবাহনের চাপ কমলেও আজ বৃহস্পতিবারও কিছু স্টেশনে দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। বেলা একটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, কল্যাণপুর, আসাদগেট ও বিজয় সরণি এলাকার ১০টি ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এর মধ্যে সাতটিতে তেল বিক্রি চলছিল এবং তিনটিতে বিক্রি বন্ধ ছিল।
বেশির ভাগ স্টেশনে স্বাভাবিক অবস্থা
চালু থাকা ফিলিং স্টেশনগুলোর বেশির ভাগে তেমন ভিড় না থাকলেও বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন ও আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের কিছুটা দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। দুপুরে পাঁচটি ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি করতে দেখা যায়, যেখানে যানবাহনের দীর্ঘ সারি ছিল না। এসব স্টেশন হলো মিরপুরের শেওড়াপাড়ার সোবাহান ফিলিং স্টেশন, আগারগাঁও তালতলার হাসান ফিলিং স্টেশন, কল্যাণপুরের সোহরাব ফিলিং স্টেশন ও খালেক সার্ভিস স্টেশন এবং আসাদগেটের সোনারবাংলা সার্ভিস স্টেশন।
সরকার জ্বালানি তেল বিক্রি সীমিত করে দেওয়ার পর এসব ফিলিং স্টেশনে আধা কিলোমিটার থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ সারি দেখা গিয়েছিল। তবে বেলা দেড়টার দিকে সোবাহান ফিলিং স্টেশনে জ্বালানির জন্য অপেক্ষায় থাকা যানবাহনের সারি দেখা যায়নি। ওই সময় ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার একটি সারিতে পাঁচটি প্রাইভেট কার ছিল এবং দুটি সারিতে মোটরসাইকেল ছিল ১৩টি।
ফিলিং স্টেশন কর্মীদের বক্তব্য
জ্বালানি কিনতে যাওয়া যানবাহনের সারি স্বাভাবিক সময়ের মতো রয়েছে বলে জানান ফিলিং স্টেশনের বিক্রয়কর্মী মোহাম্মদ রাব্বি। তিনি বলেন, "সকাল থেকেই তেমন একটা দীর্ঘ সারি ছিল না। ফিলিং স্টেশনের সীমানার ভেতরেই মোটরসাইকেলগুলো দাঁড়াতে পেরেছিল। লাইনে দাঁড়ানো প্রাইভেট কারের সংখ্যাও ১০-১২টার বেশি হয়নি। ঈদের ছুটির পাশাপাশি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় মানুষের এমন ভোগান্তি কমে গেছে।"
কাছেই তালতলার হাসান ফিলিং স্টেশনে গিয়েও যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়নি। ওই ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার সারিতে ১৫-২০টি মোটরসাইকেল ও ৭টি প্রাইভেট কার দেখা গেছে। এর বাইরে ডিজেল কেনার সারিতে তিনটি লেগুনা ছিল। ওই ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সুজন মিয়া বলেন, "গতকাল রাত তিনটার দিকে জ্বালানি ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাই সকালে বিক্রি বন্ধ ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিক্রি শুরু হয়। তবে গত কয়েক দিনের মতো যানবাহনের লম্বা সারি হয়নি। মোটরসাইকেলচালকেরা পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে তেল কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। কখনো এর চেয়ে কম সময় লাগছে।"
দুটি বড় স্টেশনে দীর্ঘ সারি
ঢাকার অন্যতম বড় দুটি ফিলিং স্টেশন বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল কিনতে যাওয়া যানবাহনের কিছুটা দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বেলা তিনটার দিকে ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তেল কেনার জন্য অপেক্ষমাণ প্রাইভেট কারের সারি উত্তর দিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শেষ সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে ৩৯টি গাড়ি অপেক্ষমাণ দেখা গেছে এবং ওই সময় তেলের জন্য শতাধিক মোটরসাইকেলচালককে অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।
ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের প্রবেশমুখে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোটরসাইকেলচালক সিয়াম হোসেন। তিনি বলেন, "গত সোমবার ফুল ট্যাংক জ্বালানি নিয়েছিলাম। সেদিন প্রায় এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়েছিল। এরপর মঙ্গল-বুধবার কোনো তেল কিনিনি। আজকে আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি।" প্রায় ২০ মিনিট হয় তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছেন বলে জানান।
এর আগে আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে গিয়েও কিছুটা দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। বেলা পৌনে তিনটার দিকে ওই ফিলিং স্টেশনে তেল কিনতে ২৬টি প্রাইভেট কার ও অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেলচালককে সারিতে দাঁড়াতে দেখা গেছে। তেল কেনায় নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দেওয়ার পর কোনো কোনো দিন এই ফিলিং স্টেশনে তেল কিনতে যাওয়া যানবাহনের সারি জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের সামনে দিয়ে লেক ড্রাইভ সড়ক হয়ে বিজয় সরণি পর্যন্ত বিস্তৃত দেখা গেছে।
এই ফিলিং স্টেশনে তেল কেনার সারিতে ছিলেন প্রাইভেট কারের চালক মুন্না মিয়া। তিনি জানান, তিনি ১৫ মিনিট হয় সারিতে দাঁড়িয়েছেন এবং আরও ১০-১৫ মিনিট সময় লাগতে পারে বলে মনে করেন।
তিনটি স্টেশনে বিক্রি বন্ধ
দুপুরে তিনটি ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ দেখা গেছে। ফিলিং স্টেশনগুলো হলো শেওড়াপাড়ার এ এস ফিলিং স্টেশন, শ্যামলীর মেসার্স সাহিল ফিলিং স্টেশন এবং কল্যাণপুরের কমফোর্ট ফিলিং স্টেশন। এর মধ্যে বেলা আড়াইটার দিকে সাহিল স্টেশনে কথা হয় বিক্রয়কর্মী মো. শামীমের সঙ্গে। তিনি বলেন, "সকাল থেকে বিক্রি চালু ছিল। বেলা সোয়া দুইটার দিকে তাঁরা বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। এখন তেলের মজুত পরীক্ষা করে দেখবেন। রিজার্ভ ট্যাংকে পর্যাপ্ত তেল থাকলে ইফতারের পর আবার বিক্রি শুরু করবেন।"
পটভূমি ও সরকারি পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ কমায় দেশেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। আতঙ্কে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে দ্বিগুণ হারে জ্বালানি তেল কেনা শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৬ মার্চ জ্বালানি তেল সরবরাহে সীমা বেঁধে দেয় সরকার। তেল কেনায় সীমা বেঁধে দেওয়ায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি হচ্ছিল। তবে ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি ঠেকাতে এবং সেচের ডিজেলের চাহিদা পূরণে ১৫ মার্চ সরকার জ্বালানি তেল বিক্রির সীমা তুলে নেয়।
এসব পদক্ষেপের ফলে ঈদের ছুটিতে ঢাকার ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি বিক্রির চিত্র তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হয়েছে, যদিও কিছু স্টেশনে এখনও দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। সরবরাহ ও চাহিদার তারতম্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সরকারি নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।



