ট্রাম্প প্রশাসনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ, হরমুজ প্রণালি বন্ধে সংকট তীব্র
ট্রাম্প প্রশাসনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ

ট্রাম্প প্রশাসনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ, হরমুজ প্রণালি বন্ধে সংকট তীব্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে রীতিমতো উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোয় এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেলের দাম যে এমন ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেবে, তা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধারণার বাইরে ছিল।

যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দাম ঊর্ধ্বগতি, যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দামেও প্রভাব

ইরানের উপকূলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বিঘ্নিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যা ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়কার পরিস্থিতির কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দামও লাফিয়ে বাড়ছে, মাত্র এক সপ্তাহে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় দাম ৫১ সেন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ

পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখন আর ট্রাম্পের হাতে নেই বললেই চলে। বিদেশে যুদ্ধের সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন অর্থনীতির বড় সাফল্যগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। জ্বালানি বিশ্লেষক নিল অ্যাটকিনসন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই; বরং তা আরও বৃদ্ধির প্রবল চাপ রয়েছে।’

শেয়ারবাজারে অস্থিরতা এবং গ্যাসের দাম কমানোর জন্য গত শনি ও সোমবার কর্মকর্তারা জরুরি ভিত্তিতে একগুচ্ছ বিকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছেন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে:

  • স্থানীয় বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়াতে আইনি বিধিনিষেধ শিথিল করা।
  • বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যে সরাসরি হস্তক্ষেপের মতো চরম পদক্ষেপ গ্রহণ।
  • ‘জোনস অ্যাক্ট’-এর বিধিনিষেধ শিথিল করে দেশজুড়ে তেল সরবরাহ বৃদ্ধি করা।

হরমুজ প্রণালি সংকট ও সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা

হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেলবাহী ট্যাংকারগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারছে না, এবং কবে নাগাদ এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, তার কোনো লক্ষণই আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য সামরিক পাহারা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে, যদিও এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত সম্ভব হবে তা অনিশ্চিত। সোমবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তাঁর প্রশাসন এখন হরমুজ প্রণালি ‘দখলের’ কথা ভাবছে।

কৌশলগত জরুরি তেলের মজুত ও রাজনৈতিক প্রভাব

এত দিন কঠোরভাবে নাকচ করে দিলেও এখন কৌশলগত জরুরি তেলের মজুত (এসপিআর) ব্যবহার প্রসঙ্গে মুখ খুলতে শুরু করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে ২০২২ সালে জো বাইডেন প্রশাসনের এসপিআর ব্যবহারের অভিজ্ঞতার কারণে এই পদক্ষেপে তাঁদের মধ্যে তীব্র অনীহা কাজ করছে। আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির আধিপত্য ধরে রাখতে গ্যাসের দাম কমানোকেই প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছিল, কিন্তু বর্তমান সংকটে সেই পরিকল্পনা হুমকির মুখে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

জ্বালানিবিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের বিবেচনাধীন বিকল্প পদক্ষেপগুলো তেলের বাজার ও গ্যাসের দামে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও তা যৎসামান্য হবে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে দিনে প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি পূরণে এসব পদক্ষেপ অপর্যাপ্ত। ফিন্যান্সিয়াল রিসার্চ ফার্মের টোবিন মার্কাস বলেন, ‘ছয় দিন ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি জাহাজও পার হতে পারেনি। এই রূঢ় সত্যকে আড়াল করার ক্ষমতা তাদের নেই।’

সামগ্রিকভাবে, তেলের বাজার স্থিতিশীল করার একমাত্র নিশ্চিত পথ হলো যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটানো, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। ট্রাম্প প্রশাসন এখনো এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।