দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেল সংকট: ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, চালকদের ভোগান্তি
দেশের বিভিন্ন জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে ফিলিং স্টেশনের বাইরে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকারের চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। অনেক পাম্পে ‘তেল নাই’ লেখা সাঁটিয়ে বিক্রি বন্ধ রয়েছে, আবার কোথাও ‘সীমিত পরিসরে’ বিক্রি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে চালকরা চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন।
রাঙামাটিতে জ্বালানি তেলের ঘাটতি
রাঙামাটি শহরের ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের চারটি ফিলিং স্টেশনে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি হয়, কিন্তু দুই দিন ধরে অধিকাংশ স্টেশনে অকটেন বিক্রি বন্ধ রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে একটি ফিলিং স্টেশনে অকটেন ও ডিজেল বিক্রি হলেও দুপুরের পর তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অকটেনের সংকটের কারণে মোটরসাইকেল চালকরা বিপাকে পড়েছেন, অনেকে গাড়ি নিয়ে বের হতে পারছেন না। ডিজেল বিক্রি বন্ধ থাকায় ছোট নৌযানের চালকরাও ভাড়ায় নৌযান চালাতে পারছেন না।
শহরের কল্যাণপুর, রাজবাড়ী, বনরূপা ও পুরোনো বাসস্টেশনে অবস্থিত ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের অভাব দেখা গেছে। কল্যাণপুরের তান্যবি এন্টারপ্রাইজ ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সুফল চাকমা জানান, সোমবার ৮ হাজার লিটার ডিজেলের চালান পাওয়া গিয়েছিল যা মঙ্গলবার শেষ হয়ে গেছে, এবং দুদিন ধরে অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। রাজবাড়ী এলাকার এস এম পেট্রোলিয়াম এজেন্সিতেও অকটেন ও ডিজেল না থাকায় বিক্রি বন্ধ রয়েছে।
জয়পুরহাটে তেলের তীব্র সংকট
জয়পুরহাট জেলায় বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেক পাম্পে তেল বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা সদর ও উপজেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে পেট্রল, অকটেন ও ডিজেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি পাম্পে তেল শেষ হয়ে গেছে। মোটরসাইকেল চালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, তিনি প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটার মোটরসাইকেল চালান, কিন্তু পাম্পে তেল না পাওয়ায় তিনি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
খুলনায় পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও আতঙ্ক
খুলনায় জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ডিপোগুলোতে মজুত স্বাভাবিক থাকলেও পাম্পগুলোতে চাহিদার ২৫ শতাংশ কম সরবরাহ করা হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। মোটরসাইকেল চালকরা ২ লিটারের স্থলে ২০০ টাকার তেল পাচ্ছেন, এবং নিষিদ্ধ থাকলেও বোতলে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কেসিসি পেট্রল পাম্পের সুপারভাইজার মুজিবুর রহমান জানান, ডিপো থেকে দৈনিকের চাহিদা থেকে কম সরবরাহ করা হচ্ছে, যা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে সংকট সৃষ্টি করছে।
বরিশালে অকটেন সংকট ও পেট্রলের শঙ্কা
বরিশালে পেট্রল পাম্পগুলোতে অকটেন সংকট দেখা দিয়েছে, এবং পেট্রলের সংকট থাকায় দুই লিটারের বেশি মিলছে না। নগরীর অধিকাংশ পাম্পে অকটেন না পেয়ে অনেক চালককে খালি হাতে ফিরে যেতে দেখা গেছে। নতুন বাজার, নথুল্লাবাদ, কাশিপুর, রুপাতলীসহ বিভিন্ন এলাকার পেট্রোল পাম্পে একই চিত্র দেখা যায়। নথুল্লাবাদের সুরভী ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নিতে আসা প্রাইভেটকারচালক সবুজ বলেন, তিনি অকটেন না পেয়ে খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন।
ময়মনসিংহে ফিলিং স্টেশন বন্ধ ও চালকদের বিপদ
ময়মনসিংহ জেলায় জ্বালানি তেলের মজুত না থাকায় বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রয়েছে, যা মোটরবাইক চালকসহ অন্যান্য যানবাহন চালকদের বিপাকে ফেলেছে। মোটরসাইকেল চালক আবদুল্লাহ বলেন, তিনি সারাক্ষণ মোটরবাইক চালিয়ে কাজ করেন, কিন্তু জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। শহরের স্টার ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার মোখলেসুর রহমান জানান, ডিপোগুলো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, এবং দুদিন ধরে তেলের জন্য ডিপোতে গাড়ির লাইন দাঁড়িয়ে আছে।
রাজশাহীতে ফিলিং স্টেশনে উপচে পড়া ভিড়
রাজশাহীর বিভিন্ন তেলের পাম্পে গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। পবা উপজেলার নওহাটা বাজার এলাকার রুচিতা ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়, যেখানে তেল নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। মোটরবাইকে তেল নিতে আসা মারুফ হোসেন বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এবং চাহিদার তুলনায় কম তেল দেওয়া হচ্ছে।
সিলেটে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা ও ধর্মঘট
সিলেটজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে, যার ফলে চালকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তেল চাহিদা মতো না দেওয়ায় সোমবার সন্ধ্যায় একটি ফিলিং স্টেশনের কর্মীর ওপর হামলার প্রতিবাদে সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার বেলা ২টা পর্যন্ত ফিলিং স্টেশন বন্ধ রেখে ধর্মঘট পালন করা হয়। পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট ও পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রিয়াশাদ আজিম হক আদনান জানান, সিলেটে জ্বালানি তেলের ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপণন সুষম না হওয়া এবং সরবরাহ সীমা বেঁধে দেওয়ার কারণে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
রংপুরে পেট্রল ও অকটেন সংকট
রংপুরে ফিলিং স্টেশনগুলোতে রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রয় করা হলেও বেশিরভাগ পাম্পে পেট্রল ও অকটেনের সংকট দেখা দিয়েছে। নগরীর বিভিন্ন পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রংপুর ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রহমান আলী বলেন, ডিপো থেকে আগের মতো তেল সরবরাহ করলে কোনও সংকট হতো না, কিন্তু তাদের চাহিদা ছয় হাজার লিটার হলেও সরবরাহ করা হচ্ছে তিন হাজার লিটার, যা সংকট সৃষ্টি করছে।
এই পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকরা জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং কোথাও তেলের দাম বেশি নেওয়া হলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে আতঙ্কিত হয়ে গ্রাহকরা অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করার চেষ্টা করছেন, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে।



