বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে এখন টিনের চালায় সৌরবিদ্যুতের প্যানেল দেখা যায়। কিন্তু দেশে সৌরবিদ্যুৎ খাতে এক অদ্ভুত বাস্তবতা বিদ্যমান। একদিকে ছাদে ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর সম্ভাবনা অফুরন্ত; রোদ তো আমাদের কোনো দিন কম পড়েনি। অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরা হিসাব মেলাতে পারছেন না, উদ্যোক্তারা হাঁপিয়ে উঠছেন শুল্কের জটিলতায়। ইরান যুদ্ধ বুঝিয়ে দিয়েছে যে জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের স্বনির্ভরতা দরকার। আসন্ন জাতীয় বাজেট এই অচলাবস্থা ভাঙার একটা বড় সুযোগ। প্রশ্ন হলো, সুযোগটা আমরা কাজে লাগাব কি না।
শুল্কের কাঁটা
রুফটপ সোলার খাতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা প্রায়ই একটা হিসাব দেন। সোলার প্যানেল আমদানিতে মোট শুল্কভার প্রায় ২৭ শতাংশ, ইনভারটারে প্রায় ২৯ শতাংশ আর পিভি-ডিজি কন্ট্রোলারে সেটা উঠে যাচ্ছে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত। শুধু কেবলের ক্ষেত্রেই শুল্কভার ৫৮ শতাংশের বেশি।
তুলনা করলে ছবিটা আরও পরিষ্কার হয়। ভারত নিজেদের মডিউল শিল্প রক্ষায় শুল্ক রেখেছে, কিন্তু দেশীয় উৎপাদন যথেষ্ট বলে সেটার যুক্তি আছে। পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ইত্যাদি দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামে শূন্য বা নামমাত্র শুল্ক রেখেছে এবং বিনিয়োগ টেনে নিচ্ছে। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এখানে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিটাই নেই, কারণ রক্ষা করার মতো শিল্প এখনো তৈরি হয়নি।
এমতাবস্থায় শুল্ক আসলে কাকে সুরক্ষা দিচ্ছে? বরং শুধু খরচ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে কিছু ক্ষেত্রে মোট শুল্কভার (টিটিআই) ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে; যেমন ডিসি কেবল, প্যানেল স্ট্রাকচার বা ব্যাটারির ক্ষেত্রে। অর্থাৎ একটি সোলার প্রকল্পের মূল প্রযুক্তি খরচের পাশাপাশি কর কাঠামোই প্রকল্প ব্যয়ের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এতে মোট খরচ কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়, যা গ্রিড বিদ্যুতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাকে কমিয়ে দেয়।
মূল্যায়নপদ্ধতির সমস্যা
শুল্কের পাশাপাশি একটি কম আলোচিত কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো মূল্যায়নপদ্ধতি। বর্তমানে আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা হয় ওজনভিত্তিক, মানে কেজি হিসাবে। কিন্তু বাস্তবে একটি উচ্চমানের ইনভারটার বা বিএমএস বোর্ড ওজনে কম হলেও দামে অনেক বেশি। ফলে ওজনভিত্তিক মূল্যায়নে প্রকৃত আমদানি মূল্যের ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি শুল্কের বোঝা চাপছে আমদানিকারকের ওপর।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাস্টমস এর ভ্যালুয়েশন চুক্তিতে স্পষ্টভাবে অর্থাৎ প্রকৃত চালান মূল্যভিত্তিক মূল্যায়নের কথা বলে। বাংলাদেশ সে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। অথচ এ খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন একটি পদ্ধতি এখনো চালু আছে। এই একটি সংস্কারই বিনিয়োগের পরিবেশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে দিতে পারে। একটি ভুল মূল্যায়ন পুরো কর কাঠামোতে শুল্ক নয়—ভ্যাট, আয়কর, টার্নওভার ট্যাক্স শুধু বাড়াতেই থাকে, যা বিনিয়োগের ইন্টারনাল রেট অব রিটার্নকে (আইআরআর) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
কর অবকাশ: বৈষম্যটা কোথায়?
বাংলাদেশে ইউটিলিটি-স্কেল সোলার বা বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পগুলো কর অবকাশ সুবিধা পায়। কিন্তু একই বিদ্যুৎ ছাদে উৎপাদন করলে সে সুবিধা নেই। এটা যুক্তিসংগত নয়। উৎপাদিত বিদ্যুৎ একই, শুধু উৎপাদনের স্থান ভিন্ন। রুফটপ সোলার বরং গ্রিডের ওপর পিক-লোড চাপ কমায়, বিতরণ লাইনের ক্ষতি কমায় এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুতের ব্যয় কমিয়ে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ায়। অথচ এ মডেলকেই কর সুবিধা থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।
সুপারিশ সরল: প্রথম ১০ বছর ১০০ শতাংশ, পরবর্তী ৩ বছর ৫০ শতাংশ এবং তার পরবর্তী ২ বছর ২৫ শতাংশ কর অবকাশ দেওয়া হোক; ক্যাপেক্স, ওপেক্স, আইপিপি, এমপিপিসহ সব ব্যবসায়িক মডেলের জন্য সমানভাবে। এ কাঠামো ভারতের সোলার ইনসেন্টিভ মডেলের অনুরূপ, যেখানে একই কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ গত দশকে কয়েক গুণ বেড়েছে।
ভর্তুকির ফাঁদ থেকে বের হতে হবে
এতক্ষণ যা বললাম, তার সবই করদাতার টাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। কিন্তু একটা বড় সমস্যা আছে, যেটা সরাসরি বাজেটের ওপর চাপ ফেলছে; সেটা হলো বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি। বাংলাদেশে প্রতিবছর বিদ্যুৎ খাতে সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা। মূলত তেলভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে ভোক্তাকে কম দামে দেওয়ার এ চক্রে রাষ্ট্রের অর্থ ক্রমেই নিঃশেষ হচ্ছে। চলতি বছর জ্বালানিতে ভর্তুকির জন্য এ খরচ আরও বাড়বে। আমাদের গড় উৎপাদন খরচ ১২ টাকা ৩৪ পয়সা প্রতি ইউনিট, সেখানে সোলার শুল্কায়ন দিয়েও ৮ থেকে ৯ টাকা প্রতি ইউনিটে উৎপাদন হতে পারে। সোলার উপকরণে শুল্ক থেকে রাজস্ব আসে কয়েক শ কোটি টাকার বেশি নয়। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটি ছোট রাজস্ব ধরে রাখতে গিয়ে একটি বড় ব্যয় (ভর্তুকি) বহন করছে যা একটি ক্ল্যাসিক রাজস্ব ভুল পরিকল্পনার উদাহরণ।
এ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে শুল্ক কমানো আসলে রাজস্ব ছাড় নয়, বরং ব্যয় কমানোর কৌশল। আইএমএফের সঙ্গে চুক্তির অংশ হিসেবেও ধীরে ধীরে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হবে। ফলে চাপটা এসে পড়ছে সাধারণ মানুষ ও শিল্পের ওপর। এখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগটা সরাসরি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরা ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে গ্রিড থেকে কেনার পরিমাণ কমে। ভর্তুকির বোঝা কমে। সরকারের আর্থিক চাপ কমে। ভিয়েতনাম ঠিক এ পথেই হেঁটেছে—ফিড ইন ট্যারিফ নীতির মাধ্যমে রুফটপ সোলারকে উৎসাহিত করে শিল্পে গ্রিডনির্ভরতা কমিয়েছে, একই সঙ্গে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বেড়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি দেওয়া মানে পুরোনো একটি ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা। যে অর্থ ভর্তুকিতে যাচ্ছে, তার একটি অংশও যদি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবকাঠামো ও শুল্কসহায়তায় যায়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের সাশ্রয় অনেক বেশি হবে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা ২০ শতাংশ যদি নবায়নযোগ্য খাত থেকে উৎপাদন করতে পারে, তাহলে সরকারের গড় উৎপাদন খরচ অন্তত ২ টাকা কমানো সম্ভব।
বাজেটে কী চাই
সংক্ষেপে, আসন্ন বাজেটে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সব উপকরণে আমদানি শুল্ক শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা। প্যানেল, ইনভারটার, ব্যাটারি, বিএমএস, প্যানেল স্ট্রাকচারসহ সংশ্লিষ্ট সব পণ্যে এ সুবিধা দিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব কমবে, কিন্তু বিনিয়োগ বাড়লে দীর্ঘ মেয়াদে করযোগ্য আয় ও কর্মসংস্থান দুটোই বাড়বে।
দ্বিতীয়ত, ওজনভিত্তিক মূল্যায়নপদ্ধতি বদলে প্রকৃত চালানমূল্যভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করতে হবে। এটি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তৃতীয়ত, রুফটপ সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক গেজেট নোটিশের মাধ্যমে কর অবকাশ কার্যকর করতে হবে, ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্পের মতো একই কাঠামোয়।
চতুর্থত, নেট মিটারিং ও নীতিসহায়তা জোরদার করতে হবে। শুধু কর ও শুল্কসুবিধা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে নেট মিটারিং নীতি থাকলেও এর বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়। বাজেটে ঘোষণা দেওয়া দরকার যে স্বল্প ও মাঝারি মাপের সব রুফটপ সোলার প্রকল্পের জন্য স্বয়ংক্রিয় নেট মিটারিং অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে এবং বিল পরিশোধের সময়সীমা ৪৫ দিনের মধ্যে নির্ধারণ করতে হবে।
পঞ্চমত, সবুজ ঋণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ। বর্তমানে ব্যাংকগুলো সবুজ ঋণ দিলেও সুদের হার সাধারণ ঋণের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক নয়। বাজেটে ঘোষণা দেওয়া যেতে পারে যে রুফটপ সোলার স্থাপনে নেওয়া ব্যাংকঋণের ওপর সুদ হারের ২% ভর্তুকি সরকার দেবে অথবা এ ধরনের ঋণকে ন্যূনতম মূলধন প্রয়োজনীয়তার (সিআরআর) বাইরে রাখা হবে।
আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি
ভারত ২০২৩ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ টেনেছে। পাকিস্তান দুরবস্থার মধ্যেও, সোলার আমদানিতে শূন্য শুল্কের কারণে গত দুই বছরে রুফটপ সোলার ৫ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই ২০ গিগাওয়াটের বেশি রুফটপ সোলার চালু করেছে। বাংলাদেশে রুফটপ সোলারের স্থাপিত ক্ষমতা এখনো মাত্র ২৫০-৩০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদাহরণ: একটি টেক্সটাইল কারখানা ছাদে ১ মেগাওয়াট সোলার বসিয়ে বছরে ১২-১৩ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এতে তাদের বিদ্যুৎ বিল কমছে ১.২-১.৫ কোটি টাকা, একই সঙ্গে গ্রিডের ওপর চাপও কমছে। এ ধরনের উদাহরণ দেখায় যে কর অবকাশ ও শুল্ক সুবিধা দিলে শিল্প খাত আরও দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরিত হতে পারে।
এর বাইরেও একটি বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো এখন পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ‘কার্বন ট্যাক্স’ বা সিবিএএম নীতি কঠোর করছে। অর্থাৎ আমাদের তৈরি পোশাক বা শিল্পজাত পণ্য যদি গ্রিন এনার্জি ব্যবহার করে উৎপাদিত না হয়, তবে ভবিষ্যতে রপ্তানির বাজারে আমাদের অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হবে অথবা সক্ষমতা হারাতে হবে। রুফটপ সোলার শুধু বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় করে না, এটি আমাদের রপ্তানিমুখী পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে ‘সবুজ পণ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাই বাজেটে এই খাতের প্রণোদনা আসলে পরোক্ষভাবে আমাদের রপ্তানি খাতেরই সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
বাজেট শুধু সংখ্যার দলিল নয়, এটি অগ্রাধিকারের ঘোষণা। যদি আমরা সত্যিই জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা চাই, তাহলে এই বাজেটেই সিদ্ধান্তটা নিতে হবে। ভর্তুকি দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থা আর কত দিন টানা যাবে?
এই পাঁচটি সংস্কার শুল্ক শূন্যকরণ, সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি, কর অবকাশ, নেট মিটারিং জোরদারকরণ এবং সবুজ ঋণ সম্প্রসারণ একসঙ্গে কার্যকর হলে একটি নিজস্ব ইকোসিস্টেম তৈরি হবে, যেখানে কম খরচ, বেশি বিনিয়োগ, বেশি উৎপাদন, কম ভর্তুকি, বেশি আর্থিক স্থিতিশীলতা এই চক্রটি কাজ করবে।
রোদ আমাদের আছে। নীতিটুকু শুধু বাকি। তাহলেই শুধু আমরা জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব।
সুবাইল বিন আলম পরিচালক, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল ও রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন
মাশিদ রহমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক, র্যাংকন সোলার



