যুদ্ধের তাপে বাংলাদেশে ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে, সাধারণ মানুষ চাপে
যুদ্ধের তাপে বাংলাদেশে ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে

ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ হাজার মাইল দূরে হলেও তার প্রভাব বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, বিদ্যুতের বিল, কৃষকের জমি ও বাজারের থলিতে এসে পড়তে পারে। এই আশঙ্কা এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

ভর্তুকির বিপুল চাহিদা

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি পরিসংখ্যান, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাষায় এর অর্থ হলো—বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বাড়লে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। সরকার যদি ভর্তুকি না দেয়, তাহলে সেই অতিরিক্ত খরচের বড় অংশ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতের চাপ

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাত। বিদ্যুৎ বিভাগ প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে। সরকার কম দামে বিদ্যুৎ দিতে চাইলে এই বাড়তি খরচ তাকে বহন করতে হবে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কতদিন এই বোঝা বহন করতে পারবে? ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। সামনে আবারও দাম সমন্বয়ের আলোচনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে ভর্তুকি কমানোর একটি পথ হতে পারে গ্রাহকদের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া।

গ্যাস খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। শুধু আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের জন্যই প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে পেট্রোবাংলা। যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। এর অর্থ হলো, গ্যাসের দাম নিয়েও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটছে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কৃষি ও খাদ্য খাতে প্রভাব

অন্যদিকে কৃষি খাতেও চাপ বাড়ছে। সারের আন্তর্জাতিক দাম বাড়ছে, বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও। ফলে কৃষি মন্ত্রণালয় ১৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। কৃষককে কম দামে সার দিতে না পারলে উৎপাদন খরচ বাড়বে। আর উৎপাদন খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়বে চাল, ডাল, শাকসবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব খাদ্যপণ্যের বাজারে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ও ১২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়েছে। কারণ ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং স্বল্পমূল্যে খাদ্য বিক্রির কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সরকারের আগের চেয়ে বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে।

অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতামত

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি অবশ্যই একটি বড় কারণ। তবে দেশের ভেতরেও কিছু পুরোনো সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের অদক্ষতা, উচ্চ ব্যয়, অপচয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর ভর্তুকির বোঝা বাড়ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সংকট দেখা দিলে সেই চাপ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে? সরকার যদি বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে না পারে, তাহলে ঋণ নিতে হবে। আর বেশি ঋণ মানে বাজারে টাকার চাপ বাড়া, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা।

অর্থাৎ যুদ্ধের আগুন হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে জ্বলছে, কিন্তু তার তাপ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও অনুভব করতে শুরু করেছেন।

আগামী বাজেটের চ্যালেঞ্জ

আগামী বাজেটে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—একদিকে মানুষের জন্য বিদ্যুৎ, গ্যাস, সার ও খাদ্যের দাম সহনীয় রাখা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ সামাল দেওয়া।

যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়, তাহলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। কিন্তু সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, সরকারের জন্যও, সাধারণ মানুষের জন্যও।