বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত ৩৫ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র মূল্য অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়।
অর্থায়নের উদ্দেশ্য
১৫ মে অনুমোদিত এই অর্থায়ন চলমান জ্বালানি খাত নিরাপত্তা বৃদ্ধি প্রকল্পের আওতায় দেওয়া হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করবে।
এলএনজি আমদানি নির্ভরতা
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এলএনজির দাম তীব্রভাবে বেড়েছে এবং সরবরাহ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জনআর্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
অর্থায়নের কাঠামো
এই অতিরিক্ত অর্থায়নের মূল লক্ষ্য হলো পেট্রোবাংলাকে সাশ্রয়ী মূল্যের অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা, যাতে তারা নিয়মিত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। পেমেন্ট গ্যারান্টি সুরক্ষিত করার মাধ্যমে পেট্রোবাংলা অস্থির ও ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে সরে এসে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিতে যেতে পারবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীলতা
এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত হলে দেশের জ্বালানি অবকাঠামো আরও স্থিতিশীল হবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থায়নের ধরণ
প্রচলিত সরাসরি ঋণের পরিবর্তে এই অর্থায়ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) পেমেন্ট গ্যারান্টি-ব্যাকড ফাইন্যান্সিং সুবিধার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এই আর্থিক সরঞ্জামের মাধ্যমে এলএনজি আমদানিতে পেমেন্ট নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ক্রেডিট লাইন সরবরাহ করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
এই ব্যবস্থা সরকারকে জ্বালানি ক্রয় কৌশল পুনর্গঠনে সহায়তা করবে, যা দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পরিকল্পনার পাশাপাশি হঠাৎ বৈশ্বিক বাজারের ধাক্কা মোকাবিলায় নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
প্রকল্পের বিবরণ
মূল ৩৫ কোটি ডলারের জ্বালানি খাত নিরাপত্তা বৃদ্ধি প্রকল্পটি বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক পর্ষদ ১৮ জুন ২০২৫ তারিখে অনুমোদন করেছিল এবং এটি ৩১ ডিসেম্বর ২০৩১ পর্যন্ত চলবে। সর্বশেষ অর্থায়নের মাধ্যমে প্রকল্পটির মোট সক্ষমতা ৭০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জিন পেসমে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এলএনজির দাম বাড়িয়েছে এবং সরবরাহ চেইন জটিল করে তুলেছে। নিট জ্বালানি ও গ্যাস আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ধরনের রাজস্ব চাপের মুখে পড়েছে।
প্রকল্পের টাস্ক টিম লিডার এবং বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ওলায়িঙ্কা এডেবিরি বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস ডিজেল বা ফার্নেস অয়েলের তুলনায় সস্তা ও কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানি। তাই নিরবচ্ছিন্ন এলএনজি সরবরাহ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি। এই গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করলে ব্যয়বহুল তরল জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমে যাবে, যা জাতীয় কোষাগারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় এনে দেবে।



