দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন: জিডিপির মাত্র ২২.০৩% বেসরকারি বিনিয়োগ
জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগ দশ বছরের সর্বনিম্ন

দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন: জিডিপির মাত্র ২২.০৩% বেসরকারি বিনিয়োগ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ মাত্র ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি গত দশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তর। টানা চার বছর ধরে জিডিপিতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের অবদান কমছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

বিবিএসের চূড়ান্ত হিসাব: হতাশাজনক চিত্র

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপি ও বিনিয়োগের চূড়ান্ত হিসাবে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের পর এত কম বেসরকারি বিনিয়োগ আর দেখা যায়নি। গত অর্থবছরে জিডিপির আকার চলতি মূল্যে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা ছিল, যেখানে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ২২.০৩ শতাংশ।

চতুর্মুখী আক্রমণের ফল: বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান এই অবস্থাকে 'চতুর্মুখী আক্রমণের ফল' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি চারটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন:

  1. রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা: অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ও গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়ে উদ্বেগ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।
  2. সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি: দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ পলিসি রেট মূল্যস্ফীতি কমালেও বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে।
  3. প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাব: ব্যবসায় খরচ কমানো ও চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি।
  4. বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা: ট্রাম্পের পাল্টা শুল্কসহ বিশ্ববাণিজ্যে চলমান অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'এতে কর্মসংস্থান ও জিডিপির প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।'

অর্থনৈতিক প্রভাব: প্রবৃদ্ধি হ্রাস

বেসরকারি বিনিয়োগ কমার প্রভাব সরাসরি অর্থনীতিতে পড়েছে। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা করোনাভাইরাসের প্রথম বছরের (২০১৯-২০ অর্থবছরের) ৩.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কাছাকাছি। এটি গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির হার। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে গণ-আন্দোলনের সময় ব্লকেড ও কারফিউয়ের মতো ঘটনাগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল, যা পুরো অর্থবছরে বিনিয়োগকে ব্যাহত করেছে।

বিনিয়োগের ধারাবাহিক পতন

কয়েক বছর ধরেই জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ থেকে ২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল, কিন্তু এখন তা আরও কমেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ সাড়ে ২৪ শতাংশ ছিল, যা এখন ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। একইভাবে, সার্বিক বিনিয়োগ ৩২ শতাংশ থেকে সাড়ে ২৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছেন, কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।

অন্যান্য চ্যালেঞ্জ: গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও উচ্চ সুদ

বিনিয়োগ কমার পেছনে আরও কিছু কারণ কাজ করছে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উচ্চ করের বোঝা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। এছাড়া, ঋণের সুদের হার ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ হওয়ায় বিনিয়োগের খরচ বেড়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ৫৫ কোটি ডলারের নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। স্থানীয় উদ্যোক্তারাও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ধীরে চলার নীতি অবলম্বন করছেন এবং নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলে দেখেশুনে বিনিয়োগ করার পক্ষে মনোভাব দেখাচ্ছেন।

জিডিপি ও বিনিয়োগের সম্পর্ক

জিডিপি হলো একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টির মাধ্যমে সংযোজিত মোট মূল্য। এটি প্রধানত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের সমন্বয়ে গণনা করা হয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগের মাধ্যমেই নতুন পণ্য উৎপাদন ও সেবা সৃষ্টি হয়, যা জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখে। বর্তমান বিনিয়োগের এই সংকট তাই দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করছে।