পিরোজপুরে তিন শিশু ফেলে নিখোঁজ মা ফিরলেন, প্রশাসনের সহায়তায় পেলেন সেলাই মেশিন ও খাদ্য
পিরোজপুরে শিশু ফেলে নিখোঁজ মা ফিরলেন, পেলেন সহায়তা

পিরোজপুরে অভাবের তাড়নায় তিন শিশু ফেলে নিখোঁজ মা, প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে ফিরে পেলেন আশ্রয়

পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়নে এক মর্মস্পর্শী ঘটনার অবসান ঘটেছে। চরম দারিদ্র্য ও মানসিক চাপের মধ্যে তিন শিশু সন্তানকে ফেলে নিখোঁজ হওয়া মা মুক্তা বেগম (২৭) অবশেষে সন্তানদের কাছে ফিরে এসেছেন। স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও তৎপরতায় তিনি কেবল সন্তানদের সঙ্গেই পুনর্মিলিত হননি, বরং ফিরে পেয়েছেন তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন সেলাই মেশিন এবং পেয়েছেন সরকারি ও স্থানীয় সহায়তাও।

ঘটনার সূত্রপাত: ইউনিয়ন পরিষদে শিশুদের রেখে নিখোঁজ হওয়া

বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে থাকা মুক্তা বেগম তার তিন সন্তান—আরজিনি (৬ বছর), আছিয়া (৩ বছর) ও সাত মাস বয়সী খাদিজাকে নিয়ে চণ্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদে আসেন। পরে পরিষদের দোতলার বারান্দায় শিশুদের রেখে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। শিশুদের ক্রন্দন ও কান্নাকাটি দেখে স্থানীয়রা বিষয়টি অনুধাবন করে এবং তাকে খুঁজতে শুরু করে। ঘটনাটি দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা জেলা প্রশাসক আবু সাঈদের নজরে আসে।

জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিকভাবে জিয়ানগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় মুক্তা বেগমকে খুঁজে বের করা হয় এবং সন্তানদের সঙ্গে তার পুনর্মিলন ঘটানো হয়। একই সঙ্গে, স্থানীয় গ্রাম পুলিশের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া তার সেলাই মেশিনটি ফেরত দেওয়া হয়, যা ছিল তার আয়ের একমাত্র উৎস এবং জীবন-জীবিকার মূল ভিত্তি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রশাসনিক সহায়তা: নগদ অর্থ, খাদ্য ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসান মো. হাফিজুর রহমান জানান, ‘উপজেলা প্রশাসন থেকে মুক্তা বেগমকে নগদ ৩ হাজার টাকা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া চণ্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জুর পক্ষ থেকে ৩০ কেজি চাল, ৪ কেজি ডাল, ৪ লিটার তেল ও ২ কেজি চিনি দেওয়া হয়েছে। আগামীতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।’

ঘটনার পটভূমি অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুক্তা বেগমের স্বামী আমান উল্লাহ প্রায় এক বছর আগে দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন। ফলে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে তিন সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন মুক্তা। জীবন চালানোর জন্য তার আয়ের একমাত্র উৎস ছিল একটি সেলাই মেশিন। কিন্তু এক হাজার টাকা দেনার দায়ে সেটিও নিয়ে যান স্থানীয় গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলাম। এতে তিনি আরও অসহায় ও হতাশ হয়ে পড়েন, যা তাকে এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।

স্থানীয় নেতৃত্বের ভূমিকা ও মানসিক সংকটের সমাধান

ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘মুক্তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা থাকেন। তার আয়ের একমাত্র সম্বল সেলাই মেশিনটিও নিয়ে নেওয়ায় তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। বিষয়টি জানার পর গ্রাম পুলিশ নজরুল ইসলামকে সেটি ফেরত দিতে বলি। তবে তার আগেই তিনি সন্তানদের রেখে পরিষদ থেকে চলে যান। অবশেষে উদ্ধারকৃত সেলাই মেশিন, নগদ অর্থ ও খাদ্য সহায়তা বুধবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মুক্তা বেগমকে দেওয়া হয়।’

এই ঘটনা সমাজে দারিদ্র্য, পারিবারিক বিচ্ছেদ ও মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের তীব্রতা তুলে ধরে। তবে প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকরী হস্তক্ষেপ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সহমর্মিতা মুক্তা বেগমের জীবনে নতুন আশার আলো এনেছে। এখন তিনি তার সন্তানদের সঙ্গে পুনরায় একত্রিত হয়ে, সেলাই মেশিনের মাধ্যমে আয় রোজগারের পথে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়া যায় যে, সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। পিরোজপুর প্রশাসনের এই উদ্যোগ অন্যান্য এলাকার জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, যা মানবিক সংকটে দ্রুত সাড়া দেওয়ার গুরুত্বকে তুলে ধরে।