শ্যামনগরে ভিজিএফ চাল বিতরণে অনিয়ম: ১০ কেজির স্থলে মাত্র ৫ কেজি পাচ্ছেন সুবিধাভোগীরা
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নে সরকারের ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কর্মসূচির চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। উপকারভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে ১০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৪ থেকে ৫ কেজি চাল। সোমবার সকালে আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদে চাল বিতরণ কার্যক্রম চলাকালীন এই অনিয়ম ধরা পড়ে।
চাল বিতরণে ওজন কম ও পদ্ধতিগত ত্রুটি
বেলা ১১টার দিকে আটুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, ডিজিটাল স্কেল মিটার ব্যবহার না করে প্লাস্টিকের বালতিতে করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক সুবিধাভোগীকে ডিজিটাল স্কেল মিটারে ওজন করে ১০ কেজি চাল দেওয়ার কথা। তবে বাস্তবে বালতিতে করে চাল বিতরণ করা হচ্ছে। পরে কয়েকটি প্যাকেট চাল ডিজিটাল মিটারে ওজন করে দেখা যায়, কোনো প্যাকেটে ৪ দশমিক ৮৫০ কেজি, কোনোটিতে ৫ দশমিক ৩০০ কেজি, আবার কোনো প্যাকেটে ৫ দশমিক ৮০০ কেজি পর্যন্ত চাল রয়েছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন নারী জানান, তাঁদের ১০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে সাড়ে ৪ থেকে ৫ কেজি।
বরাদ্দকৃত চালের পরিমাণ ও বিতরণ প্রক্রিয়া
শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর থেকে শ্যামনগর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ১৩ হাজার ৩৩৭টি পরিবারের জন্য ১৩৩ দশমিক ৩৭০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ ছাড়া শ্যামনগর পৌরসভার ১ হাজার ৫৪৯টি পরিবারের জন্য ১৫ দশমিক ৪৯০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটুলিয়া ইউনিয়নের ১ হাজার ৩৭৩টি পরিবারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৩ দশমিক ৭৩০ টন চাল।
দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও জবাবদিহিতা
আটুলিয়া ইউপিতে চাল বিতরণের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত ট্যাগ কর্মকর্তা উপজেলা সহকারী প্রোগ্রামার শাহাদাৎ হোসেনের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তাঁকে দেখা যায়নি। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘বিতরণ কার্যক্রমে আমি ছিলাম না। আমি জেলা অফিসে মিটিংয়ে ছিলাম। যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে পিআইও অফিসে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আটুলিয়া ইউনিয়ন ভিজিএফ কমিটির সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ভিজিএফ কার্ডের সুবিধাভোগীদের তালিকা তৈরি থেকে শুরু করে চাল বিতরণ—সবকিছু ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে হয়েছে। আমরা শুধু তদারকি করেছি। তাঁরা যা করেছে, আমরা শুধু দেখেছি।’
এ বিষয়ে আটুলিয়া ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা কার্ত্তিক চন্দ্র মণ্ডল দাবি করেন, চাল কম দেওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না। তিনি বলেন, ‘সকালে ১ হাজার ৩৭৩ একটি পরিবারের জন্য পাওয়া চাল আমরা নয়টি ওয়ার্ডের মেম্বারদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধিরা ছিলেন। তাঁরা উপস্থিত থেকে চাল বিতরণ করেছেন। তাঁরাই বিষয়টি বলতে পারবেন।’
ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যানের স্বীকারোক্তি
চাল বিতরণকালে ইউনিয়ন পরিষদে উপস্থিত থাকা ইউপি সদস্য মোশারফ হোসেন ৫ কেজি করে চাল বিতরণের বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘কার্ড ছাড়া লোক বেশি হওয়াতে সবাইকে ওই চাল ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এতে পাঁচ কেজি করে চাল বিতরণ করেছি আমরা।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউপি চেয়ারম্যান আবু সালেহ জানান, তাঁর ইউনিয়নে ১ হাজার ৩৭৩ জনকে চাল দেওয়া হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই চাল বিতরণ হয়েছে। ৫ কেজি করে চাল দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক বেশি মানুষ এসেছিল, হয়তো বাইরে গিয়ে তারা ভাগ করে নিয়েছে। আমি একটি কাজে বাইরে ছিলাম, এ জন্য এ বিষয়ে ভালো বলতে পারব না।’
উপজেলা কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া ও আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস
বিষয়টি নজরে আনা হলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিরাজ হোসেন খান জানান, ওজনে চাল কম দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি যাচাই করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই কথা বলেন শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জাহান কনক। তাঁরা উভয়েই অভিযোগ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।
