ফ্যামিলি কার্ড: সরকারের অগ্রাধিকারমূলক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সূচনা
সমাজকল্যাণ ও নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্যামিলি কার্ড বর্তমান সরকারের একটি অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি হিসেবে পরিচালিত হবে। রোববার (১ মার্চ) ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি ও সাততলা বস্তি পরিদর্শনের সময় তিনি এই ঘোষণা দেন।
কার্ডের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য
মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, নারীর ক্ষমতায়ন, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়ন এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। বর্তমান বিএনপি সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে যাতে নির্বাচিত পরিবারগুলো নিয়মিত নগদ সহায়তা পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, "ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক" এই দর্শনের ভিত্তিতে ফ্যামিলি কার্ড তৈরি করা হয়েছে। দেশে বিদ্যমান ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে সমন্বয়হীনতা দূর করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য।
কারিগরি ও বাস্তবায়ন কাঠামো
সুবিধাভোগী নির্বাচনে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে প্রক্সি মিনস টেস্ট স্কোরিং ব্যবহার করা হবে। পাইলট পর্যায়ে ০-১০০০ স্কোরের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় কোয়ান্টাইলের অন্তর্ভুক্ত অতি দরিদ্র, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালিকাভুক্ত হবে।
যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে:
- গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম
- পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের অবস্থা
- নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে কার্ডটি সরাসরি পরিবারের 'মা' বা 'নারী প্রধান' সদস্যের নামে ইস্যু
আর্থিক সহায়তা ও বিতরণ পদ্ধতি
পাইলট কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত প্রতিটি পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হবে। সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ জিটুপি (এ২চ) পদ্ধতিতে সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
এছাড়াও বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি (ডিএসআর)-এ স্থানান্তর করা হবে। ভবিষ্যতে একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা, শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও পাওয়া যাবে।
প্রশাসনিক কাঠামো ও লক্ষ্যমাত্রা
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রিপরিষদ কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে:
- সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সার্বিক তত্ত্বাবধান সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি নীতি নির্ধারণ করবে
- সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কারিগরি ও ডাটা ম্যানেজমেন্ট কমিটি সার্বিক তত্ত্বাবধান করবে
- উপজেলা, ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে পৃথক বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে
২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড-এ রূপান্তর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট এলাকা নির্বাচন
পাইলট পর্যায়ে দেশের ১৪টি ভিন্ন বৈচিত্র্যের এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:
- ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি, মিরপুর অলিমিয়ারটেক বস্তি ও বাগানবাড়ী বস্তি
- চট্টগ্রামের পতেঙ্গা
- বান্দরবানের লামা
- সুনামগঞ্জের দিরাই
- ঠাকুরগাঁও সদর
এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্রের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী কড়াইল বস্তি এবং সাততলা বস্তি পরিদর্শনকালে বস্তিবাসীদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন।
এই অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফসহ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ এবং শিক্ষকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকে আধুনিক ডিজিটাল কাঠামোর মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
