খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছোট প্লাস্টিকের ঝুড়িতে করে বাদাম, বুট, পপকর্ন বিক্রি করেন গোলাম মোস্তফা। দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছে আলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত পথগুলো আবার ভরে উঠছে শিক্ষার্থীদের পদচারণে। হাসি, আড্ডা, তাড়াহুড়া—সব মিলিয়ে এক চলমান দৃশ্য। সেই ভিড়ের ভেতরেই ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে একটানা একটি শব্দ-ঠক…ঠক…ঠক। অ্যালুমিনিয়ামের লাঠি মাটিতে পড়ার সেই ছন্দ যেন ভিড়ের মাঝেও আলাদা করে শোনা যাচ্ছে। শব্দের দিকেই চোখ ফেরে। দেখা যায়—গলায় ঝুলছে ছোট্ট ঝুড়ি, তাতে বাদাম, বুট, পপকর্ন। সেই ঝুড়ি নিয়ে ধীর পায়ে হাঁটা মানুষটির নাম গোলাম মোস্তফা (৪০)।
জীবনের শুরু ও চোখের আলো হারানোর ঘটনা
খুলনা শহরের উপকণ্ঠ হরিণটানায় তাঁর বেড়ে ওঠা। বয়স যখন চার-পাঁচ, তখনই জীবিকার তাগিদে মোস্তফার বাবা পিরোজপুরের কাউখালী থেকে খুলনায় আসেন। টানাটানির সংসারে পড়াশোনাটা আর খুব বেশি দূর এগোয়নি। অল্প বয়স থেকেই কাজের খোঁজে নামতে হয়েছে তাঁকে। কখনো ভ্যান চালানো, কখনো রিকশা, কখনো কাঁচামাল বা মাছের ব্যবসা, আবার কখনো দিনমজুরি—এভাবেই কেটেছে সময়।
চোখের আলো হারানোর ঘটনা বলতে গিয়ে ফিরে যান বছর দশেক আগে। মোস্তফা বলেন, তখন ভ্যান চালাতেন। মানুষ নেওয়ার চেয়ে দূরে মালামাল পৌঁছে দেওয়ায় আগ্রহ ছিল। সেই একদিন-সন্ধ্যার পর নগরের পাওয়ার হাউস এলাকা থেকে একটি সেচের শ্যালো পাম্প নিয়ে রওনা দেন বটিয়াঘাটার এক গ্রামে। কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে রাত গড়িয়ে যায়। ঘড়িতে তখন প্রায় দুইটা। ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ভোরে উঠে জ্বর। শরীর পুড়ছে, মাথার ভেতর অদ্ভুত জ্বালা। কয়েক দিন পর জ্বর সেরে যায়, কিন্তু মাথার ভেতরের সেই অস্বস্তি পুরোপুরি যায় না। কিছুদিন পর শুরু হয় চোখে অশান্তি-হালকা ব্যথা, তারপর ধীরে ধীরে সেই ব্যথা বাড়তে থাকে।
প্রথমে বিষয়টা তেমন গুরুত্ব দেননি। কিন্তু একসময় যখন চোখে যন্ত্রণা বাড়তে থাকে, তখন ছুটতে হয় হাসপাতালে। খুলনা, তারপর ঢাকা-একটার পর একটা চিকিৎসা। চোখে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আশ্বাস—সবই ছিল, শুধু স্থায়ী সমাধান ছিল না। শেষ চেষ্টা হিসেবে পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে চিকিৎসকেরা বলেন, দীর্ঘদিন থাকতে হবে, নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে। সেই জায়গাতেই থেমে যায় তাঁর পথ। টাকার হিসাব মেলে না। থাকার খরচ, চিকিৎসার খরচ, সব মিলিয়ে অসম্ভব হয়ে ওঠে। ফিরে আসতে হয়। তারপর ধীরে ধীরে নিভে যেতে থাকে আলো। একসময় বুঝতে পারেন, চোখের ভেতর আর কোনো আলো নেই। চারপাশ অন্ধকার।
স্ত্রীর সহায়তা ও ব্যবসা শুরু
এই অন্ধকারই অনেকের জীবন থামিয়ে দেয়। কিন্তু গোলাম মোস্তফার ক্ষেত্রে তা হয়নি। কারণ, তার পাশে তখনো একজন ছিলেন, তাঁর স্ত্রী। স্ত্রীর কথা বলতে ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা মেশানো কণ্ঠে বলেন, ‘অনেক চাপ ছিল, অনেক কথা ছিল। অনেকেই বলেছে, ছেড়ে দাও। কিন্তু সে যায়নি। দুজন চিন্তা করলাম সংসারটা তো চালিয়ে রাখতে হবে। আবার অন্য সাধারণ মানুষের মতো সব কাজ তো আমাকে দিয়ে হবে না। দুজন মিলে চিন্তা করে দেখলাম পুঁজি আর পরিস্থিতি মিলে এই ব্যবসাটাই আমাদের জন্য ঠিক আছে।’
শুরু করেন বাদাম, বুট, পপকর্ন বিক্রি। প্রথমে জিরো পয়েন্ট এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু সেখানে জায়গা হয়নি। অন্য হকারদের বাধা, গাড়ির চাপ, সব মিলিয়ে টিকতে পারেননি। তখন সেখানকারই এক বয়স্ক হকার বলেছিলেন, ‘ক্যাম্পাসে যাও। ওখানে মানুষ ভালো।’ সেই কথাটাই যেন দিশা দেখায়। এর পর থেকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ই তাঁর প্রতিদিনের পথ, প্রতিদিনের সংগ্রামের জায়গা।
প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধ
সকালে স্ত্রী বাদাম ভেজে দেন। প্রস্তুতি নিতে নিতে দুপুর পেরিয়ে যায়। তারপর তিনি বের হন। ইজিবাইক থেকে ক্যাম্পাস গেটে নেমে লাঠি ঠকঠক করে পথ চিনতে চিনতে পৌঁছে যান ভেতরে। এরপর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত-ক্লাস ভবনের সামনে, প্রশাসনিক ভবনের মোড়ে, খোলা মাঠের পাশে। যেখানে মানুষের আনাগোনা, সেখানেই তার হাঁটা। মানুষের শব্দ, কোলাহল, পায়ের আওয়াজ—এসবই তাঁর পথ চিনে নেওয়ার উপায়।
দিন শেষে আয় খুব বেশি হয় তা না, কখনো ১৫০, বেশি হলে কখনোবা ২০০ টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে তাঁর সংসার-স্ত্রী আর সাত মাসের মেয়েকে নিয়ে। তবু তিনি কারও কাছে হাত পাতেন না। কারণ, তার কাছে বেঁচে থাকার মানে শুধু টিকে থাকা নয় বরং সম্মান নিয়ে টিকে থাকা।
তবে সবচেয়ে কঠিন লড়াইটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে। অনেকেই তাঁকে করুণার চোখে দেখেন, কেউ পাশ কাটিয়ে যান, কেউ আবার অন্ধ বলে তাঁর কাছ থেকে কিনতে চান না। কেউ আবার ভিক্ষুক ভাবেন। এই অবহেলা তাঁকে কষ্ট দেয়।
গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘চোখে আমার আলো নেই, কিন্তু থেমে থাকার কোনো ইচ্ছাও নেই। আমি সাহায্য চাই না। সৎ পথে বাঁচতে চাই, কিন্তু অনেকের অবহেলা কষ্ট দেয়।’
ক্যাম্পাসের মানুষের ভালোবাসা
এই ক্যাম্পাসেই কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁকে অন্যভাবে দেখেন। অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ১০ টাকার বাদাম কিনে ২০-৫০ টাকা দিয়ে দেন। মোস্তফা বলেন, ‘আমি প্যাকেট গুনে আনি। পরে দেখি টাকা বেশি হয়েছে। তখন বুঝি, কেউ ভালোবেসে দিয়েছে।’ আবার একজন শিক্ষক তাঁর সন্তানের জন্মের সময় চিকিৎসার পুরো খরচ দিয়েছেন। মেয়ের দায়িত্ব নিতে চেয়েছেন। স্ত্রীর অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় রক্ত জুগিয়েছেন শিক্ষার্থীরাই।
এই ছোট ছোট সহায়তাই গোলাম মোস্তফাকে টিকিয়ে রাখে। তবু তাঁর জীবনে বেদনার ছায়া গভীর। চিকিৎসার অভাবে আড়াই মাস বয়সী এক কন্যাসন্তানকে হারিয়েছেন। আরেকটি সন্তান গর্ভেই নষ্ট হয়ে যায়। এখন তার ঘরে সাত মাস বয়সী আরেকটি মেয়ে।
ছোট স্বপ্ন
আলোহীন চোখে দিনভর চলার ভেতরেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে ছোট ছোট স্বপ্ন। সেই স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে মোস্তফা বলেন, ‘ভালো একটা জায়গায় ছোট্ট চায়ের দোকান যদি হতো…’ কথাটা বলতে বলতেই থেমে যান। যেন ভেবে নেন আরেকবার। তারপর হালকা হেসে বলেন, ‘আমি তো পুরোপুরি পারব না। তবে মেয়েটা আর একটু বড় হলে ওর মা পারবে।’ স্বপ্নটা ছোট, কিন্তু তাঁর ভেতরে আছে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার এক অদম্য ইচ্ছা।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। কথা শেষ করতে হয়। আবার হাঁটতে থাকেন গোলাম মোস্তফা। হাঁটছেন—ঠক…ঠক…ঠক শব্দ তুলে, মানুষের ভিড়ের ভেতর দিয়ে। আর প্রতিটি পদক্ষেপে যেন তিনি প্রমাণ করে চলেছেন-মানুষের আসল শক্তি তাঁর দৃষ্টিতে নয়, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে।



